অন্যান্য সকল জরুরী বিষয়ের সাথে আল্লাহ আছেন এতটুকু বিশ্বাসই মুসলিম হওয়ার জন্য যথেষ্ট।কোথায় আছে এটা জরুরী নয়। তবে এই বিষয়টি সম্পর্কেও সঠিক ধারণা থাকা উচিত।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভাই, আপনার আকীদা ঠিক আছে। রাসূলুল্লাহ সা. কে দেয়া সালামের উত্তর কোন মানুষ শুনতে পারে এটা ঠিক নয়। হায়াতুল আম্বিয়া বিষয়ে শায়খ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. বিস্তারিত আলোচনা করেছেন তাঁর, ইসলামী আকীদা গ্রন্থে। যার শিরোনাম তাঁর ওফাত বিষয়ক বিতর্ক। পৃষ্ঠা ২২২। সেখানে আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি বলেছেন, অনেক সহীহ হাদীসে বলা হয়েছে যে, মুমিন বিশ্বের যেখানে থেকেই দরুদ ও সালাম পাঠ করবেন, ফিরিশতাগণ সেই সালাত ও সালাম রাসূলুল্লাহ সা.-এর রাওযা মুবারাকায় পৌঁছিয়ে দেবেন। উপরের হাদীসগুলি থেকে প্রমাণিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর ইন্তেকালের পরে তাঁকে এক প্রকারের জীবন দান করা হয়েছে। এই জীবন বারযাখী জীবন, যা একটি বিশেষ সম্মান ও গায়েবী জগতের একটি অবস্থা। এ বিষয়ে হাদীসে যতটুকু বলা হয়েছে ততটুকুই বলতে হবে। হাদীসের আলোকে আমরা বলব, এই অপার্থিব ও অলৌকিক জীবনে তাঁর সালাত আদায়ের সুযোগ রয়েছে। কেউ সালাম দিলে আল্লাহ তাঁর রূহ মুবারাককে ফিরিয়ে দেন সালামের জবাব দেওয়ার জন্য। রাওযার পাশে কেউ দরুদ বা সালাত পাঠ করলে তিনি তা শুনেন, আর দূর থেকে পাঠ করলে তা তাঁর নিকট পৌঁছানো হয়। এর বেশি কিছুই বলা যাবে না। বাকি বিষয় আল্লাহর উপর ছেড়ে দিতে হবে। বুঝতে হবে যে, উম্মাতের জানার প্রয়োজন নেই বলেই রাসূলুল্লাহ সা. বাকি বিষয়গুলি বলেন নি। আল্লাহ ভাল জানেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ইসলামের আদিষ্ট বিষয়গুলো পালন করতে হবে আর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো বর্জন করতে হবে এটাই মূল কথা। এরপরও পাপ হয়ে যাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। ভাল কাজ করলে সওয়াব হবে আর খারাপ কাজ করলে সওয়াব হবে। ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য আপনি যে লিস্ট তৈরী করেছেন তা আমরা পাই নি। তবে এগুলো থেকে বেচে থাকা প্রত্যেকের জন্য অপরিহার্য।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। যেগুলো হয়ে গেছে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আর ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করুন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। যেগুলো হয়ে গেছে তার জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। আর ভবিষ্যতে না করার সংকল্প করুন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। এমন পড়াশোনা তো না করাই উচিৎ যে পড়াশোনার করার জন্য মেয়েদের সাথে নিয়মিত কথা বলার প্রয়োজন হয়। তাছাড়া মেয়েদের সাথে কথা বলা ছাড়াও পড়াশোনা করা যায়। কথা বলার মাধ্যমেই পরবর্তীতে আপনি গোনাহে জড়িয়ে যেতে পারেন। সুতরাং যে কোন ওযুহাতেই হোক মেয়েদের সাথে কথাবার্তা বন্ধ রাখুন। আল্লাহ অবশ্যই আপনাকে সাহায্য করবেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ঈমান ঠিক রাখতে হবে আমলের মাধ্যমে। ফরজ ইবাদাতগুলো সঠিক সময়ে সঠিক নিয়মে আদায় করতে হবে। নফল ইবদাত ও দান-সদকা বেশী বেশী করতে হবে। সকাল-সন্ধ্যার ও অন্যন্য সময়ের জিকির-দুআগুলো যতটা সম্ভব বেশী আদায় করতে হবে। মানুষদেরকে ইসলামের পথে দাওয়াত দিতে হবে। বিভন্ন জিকির, দুআ ও আমল জানতে পড়ুন ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. রচিত রাহে বেলায়াত বইটি।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আপনি যদি আল্লাহকে ইলাহ হিসেবে মেনে নেন, মুহাম্মাদ সা. কে শেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করেন, আসমানী কিতাবেগুলো বিশ্বাস করেন, ফেরেশতা আছে বিশ্বাস করেন, আখেরাত- আখেরাতের হিসাব নিকাশ বিশ্বাস করেন, তাকদীর বা ভাগ্যে বিশ্বাস করেন তাহলে বুঝবেন আপনার ঈমান আছে। যেহেতু আপনার পাপের অনুভূতি আছে এটাও প্রমাণ আপনার ঈমান আছে। নামাযের প্রতি মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করুন, ধর্মীয় বই বেশী পড়ুন, আলেমদের ওয়াজ শুনুন, ভালো মানুষদের সাথে থাকুন, হারাম থেকে রিবত থাকুন আর আল্লাহর কাছে বেশী করে দুআ করুন, আল্লাহ যেন খাঁটি মূ’মিন হিসেবে আপনাকে কবুুল করে।
বিদআতের কোন প্রকারভেদ নেই। বিদআত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ যে আমাদের এই ধর্মে নতুন কিছু প্রবেশ করাবে যা তাতে ছিল না তাহলে সেটা প্রত্যাখ্যাত। সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৫৮৯; শরহে সুন্নাহ,হাদীস নং ১০৩। সুতরাং ধর্মের নামে নতুন উদ্ভাবিত সকল কর্মই বিদআত। আর সকল বিদআতই প্রত্যাখ্যাত। বিদআতের মধ্যে হাসানাহ বলতে কিছু নেই। বিস্তারিত জানতে দেখুন, শায়খ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. লিখিত এহ্ইয়াউস সুনান বইটি।
১। ভাই, শিরক সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শায়খ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. এর ইসলামী আকীদা এবং তাঁর বঙ্গাবানুবাদকৃত আল-ফিকহুল আকবার বই দুটি অধ্যায়ন করুন। সব লিষ্ট এখানে দেয়া সম্ভব নয়। এক কথায় বলা যায় আল্লাহ ব্যাতিত অন্য কারো কাছে চাওয়া এই নিয়তে যে সে আল্লাহর কাছ থেকে নিয়ে এসে দেবে থেকে শুরু করে আল্লাহ কোন সিফাত বা গুন অন্য কারো মাঝে আছে বিশ্বাস করা এবং আল্লাহর সত্তার সাথে কাউকে শরীক করা সবকিছুই শিরক।
২। সাজদাতে আরবী মাসনুন দুআ করবেন। তবে আরবী দুআ শেখার আগ পর্যন্ত বাংলাতে অর্থাৎ মাতৃভাষাতে দুআ করতে পারেন।
কুরআন-হাদীসের অকাট্য দলীল দ্বরা সাব্যস্ত বিধানকে কেও অস্বীকরা করলে তার ঈমান থাকবে না। তবে যদি অস্বীকার না করে কিন্তু মানে না তাহলে সে গুনাগগার হবে কিন্তু বেঈমান হবে না। সুতরাং কেউ যদি মনে করে মদ হালাল, আল্লাহর আইন অচল তাহলে তার ঈমান থাকবে না। আপনি সবকর্মকে এভাবে বিশ্লেষণ করুন।
ওয়া আলাইকুমস সালাম। জিকির করার এমন নিয়ত বা নিয়ম কুরআন হাদীসে নেই। এটা শিরক। এমন লোকের পিছনে সালাত আদায় করা ঠিক নয়। তবে উপায় না থাকলে জামাত ত্যাগ করবেন না, পড়া যদি এতটুকু সহীহ হয় যে, অর্থ পাল্টে যায় না তাহলে তার পিছনেই সালাত আদায় করবেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবনে তো এমন কিছু নেই, যার কারণে তার প্রতি খারাপ ধারণা করা যায়। কাফেররাও তো তাকে আল-আমীন উপাধী দিয়েছে। সুতরাং কেন আপনার মনে তাঁর সম্পর্কে খারাপ ধারণা আসছে তা বুঝতে পারছি না। আপনাকে বলি কোন বিষয়েই গভীর চিন্তাভাবনা করবেন না। সকল কাজে এবং কথায় স্বাভাবিকতা বজায় রাখুন। বেশী করে দুআ করুন। আউযুবিল্লাহি মিনাশ শায়ত নিররযীম বেশী বেশী পড়ুন। ইনশাআল্লাহ আপনি এই মানসিক সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভাই, পৃথিবী তার গতিতে চলবে। এখান আল্লাহ তায়ালা মুসলিম-অমুসলিম সকলকে রিযিক দান করবেন। মূল ফয়সালা হবে আখেরাতে। সুতরাং এখানে আল্লাহ মুসলিমকে রিযিক দেবেন আর অন্যদেরকে দেবেন না এটা ঠিক নয়। এমন হলে তো কিয়ামতে বিচারের দরকার ছিল না, বিচার দুনিয়াতেই হয়ে যাবে। এই পৃথিবীর ধন-সম্পদ আল্লাহ তায়ালার কাছে একটি মাছির ডানার পরিমান মূল্যেরও না।সুতরাং পৃথিবীকে তার গতিতে চলতে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত আপনার দুআ সঙ্গে সঙ্গে কবুল হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয়। তবে দুআ কবুল হতে অনেক সময় সময় লাগে সুতরাং আপনাকে ধৈর্য ধরতে হবে। যেমনটি আল্লাহ তায়লা সূরা আসরে বলেছেন। দুআর ভুমিকা অবশ্যই আছে। তবে তার চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ হলো ধৈর্য। আপনি ধৈর্য ধরুন একদিন ফল পাবেন। হতে পারে আজকের কষ্টের বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা আখেরাতে আপনার জন্য বিরাট পুরুস্কার রেখে দিয়েছেন। আল্লাহ তো কুরআন শরীফে বলেছেন, তিনি মুমিনদের ধণসম্পদ নষ্টকরার দ্বারা, ভয় দ্বারা এমনকি জীবনে নিয়ে নিয়েও পরীক্ষা নেন। সুতরাং ভাই অস্থির হবেন না, সবর করুন। একদিন আল্লাহ তায়ালা আপনাকে উত্তম প্রতিফল দিবেন ইনশাআল্লাহ।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। জ্বী, আপনি সকল নফল-সুন্নাত সালাতে উক্ত দুআগুলো পাঠ করতে পারবেন।
মুনাফেকী থেকে বাঁচতে হলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জামাতের সাথে আদায় করুন। হাদীসে যেসব কাজকে মুনাফেকীর আলামত বলা হয়েছে অর্থঅৎ মিথ্যা বলা, ওয়াদা ভঙ্গ করা, গালি দেয়া পরিহার করুন। ইসলামের সকল বিধি-বিধান যথাসাধ্য পালন করুন। আল্লাহ আমাদের সকলকে ইমানের উপর থাকার তাওফিক দান করুন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। কোন খারাপ কাজ বা কথা শুনলে বলা হয় উক্ত বাক্যটি। যার অর্থ হলো আমি উক্ত কাজ বা কথা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। পূজার জন্য নারিকেল দিলে বড় ধরণের গুনাহ হবে। কারণ পূজাতে আল্লাহর সাথে শিরক করা হয় আর কোন কিছু দিলে শিরকে সহযোগিতা করা হয়। পূজার জন্য কোন ধরণের সহযোগিতা করা যাবে না। তবে খাওয়ার জন্য দিলে বা পূজা বাদে অন্য কোন কাজের জন্য দিলে গুনাহ হবে না বরং সওয়াব হবে।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। স্বপ্ন সম্পর্কে গবেষনা না করাই উচিত। ব্যাখ্যা চাওয়ারও দরকার নেই। ভাল স্বপ্ন দেখলে ভাল আর খারপা স্বপ্ন শয়তানে পক্ষ থেকে আসে এমন বিশ্বাস থাকতে হবে। আমরা এখানে স্বপ্নের ব্যাখা দেই না। স্বপ্ন সম্পর্কে আরো জানতে আমাদের দেয়া 88 নম্বর প্রশ্নের উত্তর দেখুন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভাই, আপনার ইচ্ছাটা খুবই ভাল ও কল্যানকর। আপনার ইচ্ছা পূরণ অসম্ভব নয়। তবে সবার যে আলেম হতে হবে বিষয়টি এরকমও নয়, আপনি আপনার জায়গায় থেকে ইসলামের খেদমত করতে পারেন। আপনি যেহেতু আমাদের মসজিদে মাঝে মধ্যে জুমুআর নামায পড়নে তাই আপনার জন্য উচিৎ হলো আমাদের খতীব সাহেব তথা আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের হাদীস বিভাগের প্রধান শায়খ জাকারিয়া বিন আব্দুল ওয়াহহাব এর সাথে দেখা করে তার পরামর্শ নেয়া। আশা করি আপনি সঠিক পথের সন্ধান পাবেন। আমরা দুআ করি আল্লাহ যেন আপনাকে দীনের দায়ী হিসাবে কবুল করেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
১. মুসলিম দেশে মুসলিম মালিক কর্তৃক পরিচালেত হোটেলগুলোর মাংস হালাল বলে্ ধরে নিতে হবে। তবে এ ব্যাপারে নিশ্চিত কোন তথ্য থাকলে অর্থাৎ আল্লাহর নামে জবেহ করা হয়নি নিশ্চিতভাবে জানা থাকলে খাওয়া হারাম হবে। অমুসলিমদেশ সমূহে হালাল মাংসের হোটেল খোঁজ করে সেখানে খেতে হবে।
২. এমন হয়ে গেলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে, আশা করি তিনি ক্ষমা করে দিবেন। সতর্ক থাকতে হবে শিরকী কোন কথা-বার্তা যেন কোন অবস্থাতেই মুখে না আসে।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। একজন মুসলিমের জন্য কুরআন-সুন্নাহ মানা ফরজ। সুতরাং একজন মুসলিমকে কুরআন-সুন্নাহই মানতে হবে। কিন্তু অধিকাংশ মুসলিম এবং সাধারণ আলিমগণ কুরআন-সুন্নাহ থেকে মাসআলা-মাসায়েল জানতে অক্ষম। তাই তাদেরকে এমন কাউকে না কাউকে অনুসরণ করতে হবে যে কুরআন-সুন্নাহ থেকে মাসআলা জানতে সক্ষম। আর এভাবে কাউকে অনুসরণ করার নামই মাজহাব। তার মধ্যে চারটি মাজহাব প্রসিদ্ধ। আর এর কোন একটি মানাই সাধারণ মুসলিমের জন্য নিরাপদ । কোন মাসআলার দলীল যয়ীফ হলে আপনি কোন বিজ্ঞ আলেমের পরামর্শে সহীহ দলীল অনুযায়ী আমল করতে পারেন তবে কখনোই নিজের সিদ্ধান্ত নিবেন না। আর যারা কুরআন-সুন্নাহ থেকে মাসআলা জানতে সক্ষম তাদের তো কাউকে অনুসরণের প্রয়োজন নেই। তবে এমন ব্যক্তি পৃথিবীতে খুব কমই আছে। এই ধরণের একটি প্রশ্নের জবাবে আমাদের দেয়া 0155 নং প্রশ্নের উত্তরে শায়খ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. ইংরেজীতে লিখেছিলেন, What you do is the same that the followers of Madhabs do. They also accept some scholars and follow them. The main duty of a Muslim is to follow the Quran and Sunnah. But the most of the muslims can not study them. So the depend of mazhabs or scholars. You should try your best to study the Quran and sunnah yourself. If not possible, you should follow one Alim and make your decision depending on Sunnah, not on your personal trend or choice.
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। ভাই, আপনার আকীদা ঠিক আছে। তবে রাসূলুল্লাহ স. ওসীলা করে দুআ চাওয়া আর রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে কোন কিছু চাওয়া কিন্তু এক নয়। জীবিত ব্যক্তির কাছে সরাসরি দুনিয়ার কোন জিনিস যেমন, টাক পয়সা ইত্যাদী চাওয়া যেতে পারে তবে অপার্থিব কোন বিষয় যেমন, রোগ থেকে সুস্থতা কামনা, চিন্তামুক্ত থাকা কামনা এগুলো শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার কাছেই চাইতে হবে। অর মৃত ব্যক্তির কাছে পার্থিব, অপাথিভব কোন কিছু্ চাওয়া যাবে না, শিরক হবে। আর রাসূলুল্লাহ সা. ওসীলা কর দুআ চাওয়া শিরক নয়, জায়েজ আছে। হাদীসে রাসূলুল্লাহ সা. এর পরামর্শে এক ব্যক্তি তাঁর ওসীলা দিয়ে দুআ করেছেন বলে উল্লেখ আছে। সুনানু তিরমিযী. হাদীস নং ৩৫৭৮। হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী এবং শায়খ আলবানী রহ. সহীহ বলেছেন। বিস্তারিত জানতে দেখুন আমাদের দেয়া 36 নং প্রশ্নের উত্তর।
আল্লাহ সম্পর্কে এমন বিশ্বাস থাকাটা গোমরাহী, গুনাহের কাজ। তবে অন্য কোন গুনাহের সাথে এর তুলনা করা নিস্প্রয়োজন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। আসসুন্নাহ কিতাবটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের ছেলে আব্দুল্লাহ কর্তৃক আকিদার বিষয়ে লিখা একটি কিতাব। কিতাবটির প্রথম অধ্যায়টি জাহমিয়া সম্প্রদায়ের আকিদার বিরুদ্ধে লিখা হয়েছে, সম্ভবত তাই খতিব বাগদাদী, ইমাম জাহবী ও অন্যান্য ইমামগন কিতাবটির নাম আররদ্দ আলাল জাহমীয়া বলে উল্লেখ করেছেন। এটি আকিদার বিষয়ে একটি গ্রহনযোগ্য কিতাব। কোন কিতাব গ্রহণযোগ্য হওয়ার অর্থ এই নয় যে তাতে কোন ভুল থাকতে পারেনা। কিতাবটি ড: মুহাম¥দ বিন সাঈদ উম¥ুল ক্বুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষকের অধিনে তাহক্বিক করে এর উপর ডক্টরেট অর্জন করেছেন। ড: মুহাম¥দ বিন সাঈদ তার তাহক্বিকে এই কিতাবের সকল হাদিস ও প্রত্যেক কথার প্রামান্যতা নিয়ে পর্যালোচনা করেছেন। আপনি এই বইটি সংগ্রহ করতে পারেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
শায়খ আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর রহ. বেঁচে থাকা কালীন এই প্রশ্নের বিষয়ে তাঁর সাথে আলোচনা করেছিলাম। তিনি আমাকে যা বলেছিলেন তার সারকথা নিম্নরুপ: আমরা সবাই জানি মুহাম্মাদ সা. এর উম্মতদের মধ্যে মর্যাদার দিক দিয়ে সাহাবীদের স্থান সর্বাগ্রে। পৃথিবীর কোন ওলী, কোন দরবেশ বা আলেম মর্যদার দিকে দিয়ে সাহাবীদের সমান নয়। কুরআন ও হাদীসে সাহাবীদের মর্যাদার বিষয়টি বারবার উল্লেখ করা হয়েছে। এবার নিচের হাদীস তিনটি ভালভাবে লক্ষ্য করুন,
১। عَنْ أَبِي سَعِيدٍ ، قَالَ : اسْتَأْذَنَ أَبُو مُوسَى عَلَى عُمَرَ فَقَالَ : السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ ؟ قَالَ عُمَرُ : وَاحِدَةٌ ، ثُمَّ سَكَتَ سَاعَةً ، ثُمَّ قَالَ : السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ ؟ قَالَ عُمَرُ : ثِنْتَانِ ، ثُمَّ سَكَتَ سَاعَةً فَقَالَ : السَّلاَمُ عَلَيْكُمْ أَأَدْخُلُ ؟ فَقَالَ عُمَرُ : ثَلاَثٌ ، ثُمَّ رَجَعَ ، فَقَالَ عُمَرُ لِلْبَوَّابِ : مَا صَنَعَ ؟ قَالَ : رَجَعَ ، قَالَ : عَلَيَّ بِهِ ، فَلَمَّا جَاءَهُ ، قَالَ : مَا هَذَا الَّذِي صَنَعْتَ ؟ قَالَ : السُّنَّةُ ، قَالَ : آلسُّنَّةُ ؟ وَاللَّهِ لَتَأْتِيَنِّي عَلَى هَذَا بِبُرْهَانٍ أَوْ بِبَيِّنَةٍ أَوْ لأَفْعَلَنَّ بِكَ ، قَالَ : فَأَتَانَا وَنَحْنُ رُفْقَةٌ مِنَ الأَنْصَارِ فَقَالَ : يَا مَعْشَرَ الأَنْصَارِ أَلَسْتُمْ أَعْلَمَ النَّاسِ بِحَدِيثِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ؟ أَلَمْ يَقُلْ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : الاِسْتِئْذَانُ ثَلاَثٌ ، فَإِنْ أُذِنَ لَكَ ، وَإِلاَّ فَارْجِعْ فَجَعَلَ القَوْمُ يُمَازِحُونَهُ ، قَالَ أَبُو سَعِيدٍ : ثُمَّ رَفَعْتُ رَأْسِي إِلَيْهِ فَقُلْتُ : فَمَا أَصَابَكَ فِي هَذَا مِنَ العُقُوبَةِ فَأَنَا شَرِيكُكَ. قَالَ : فَأَتَى عُمَرَ فَأَخْبَرَهُ بِذَلِكَ ، فَقَالَ عُمَرُ : مَا كُنْتُ عَلِمْتُ بِهَذَا
আবূ সাঈদ (রা.) হতে র্বণতি, তনিি বলনে, আবূ মূসা (রা.) উমর (রা.)-এর নকিট অনুমতি চযে়ে বলনে, আসসালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পার? উমর (রা.) বলনে, এক। আবূ মূসা (রা.) কছিুক্ষণ চুপ থাকলনে। তনিি আবারও সালাম দিয়ে বলনে, আমি কি ভতিরে আসতে পার? উমর (রা.) বলনে, দুই। তারপর আবূ মূসা (রা.) অল্প সময় নীরবতা অবলম্বন করলনে। তনিি আবার বললনে, আসসালামু আলাইকুম, আমি কি আসতে পার? উমর (রা.) বললনে, তিনি এবার চলে যতেে লাগলনে। উমার (রা.) প্রহরীকে জজ্ঞিসে করলনে, তিনি কি করছনে? প্রহরী বলল, তিনি চলে গছেনে। তিনি বললনে, তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে নিয়ে এসো। তারপর তিনি উমারের সামনে এলে তিনি প্রশ্ন করলনে, আপনি এরকম করলনে কনে? তিনি বললনে, আমি সুন্নাত পালন করছে। উমর (রা.) বললনে, সুন্নাত পালন করছেনে? আল্লাহর কসম! এর সপক্ষে আপনাকে দলীল-প্রমাণ উপস্থাপন করতে হব, তা না হলে আমি আপনার ব্যবস্থা করছি (র্অথাৎ- শাস্তি দবি)। র্বণনাকারী বলনে, তারপর তনিি (আবূ মূসা) আমাদরে নকিট আসলনে। আমরা কয়জন আনসার বন্ধু একসাথে বসে ছলিাম। তনিি বললনে, হে আনসার সম্প্রদায়! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস সর্ম্পকে কি তোমরা সবার চাইতে বশেি জ্ঞাত নও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলনেনি যে, তিনবার অনুমতি চাইতে হব? তারপর তোমাকে অনুমতি দলিে তো দলি, নতুবা ফরিে যাব। উপস্থতি লোকজন তার সাথে কৌতুক করতে লাগল। আবূ সাঈদ (রা.) বলনে, এবার আমি মাথা তুলে তার দকিে তাকালাম এবং বললাম, আপনার উপর এ ব্যাপারে কোন শাস্তি হলে আমি আপনার অংশীদার হব। রাবী বলনে, তারপর তিনি উমাররে নিকট এসে এ ঘটনা বললনে। উমার (রা.) বললনে, আমি এ সর্ম্পকে জানতাম না। সুনানু তিরমিযী, হাদীস নং ২৬৯০।হাদীসটি সহীহ। ইমাম তিরমিযীসহ মুহাদ্দিসগণ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন।
২। عَنْ قَبِيصَةَ بْنِ ذُؤَيْبٍ أَنَّهُ قَالَ جَاءَتِ الْجَدَّةُ إِلَى أَبِى بَكْرٍ الصِّدِّيقِ تَسْأَلُهُ مِيرَاثَهَا فَقَالَ مَا لَكِ فِى كِتَابِ اللَّهِ تَعَالَى شَىْءٌ وَمَا عَلِمْتُ لَكِ فِى سُنَّةِ نَبِىِّ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- شَيْئًا فَارْجِعِى حَتَّى أَسْأَلَ النَّاسَ. فَسَأَلَ النَّاسَ فَقَالَ الْمُغِيرَةُ بْنُ شُعْبَةَ حَضَرْتُ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَعْطَاهَا السُّدُسَ. فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ هَلْ مَعَكَ غَيْرُكَ فَقَامَ مُحَمَّدُ بْنُ مَسْلَمَةَ فَقَالَ مِثْلَ مَا قَالَ الْمُغِيرَةُ بْنُ شُعْبَةَৃ
অর্থ: ক্ববিসা ইবনে যুয়াইব রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একজন দাদী আবু বকর সিদ্দিক রা. এর কাছে এসে তার মিরাস চাইলেন। তখন তিনি বলেন, কুরআনে তোমার (মিরাস পাওয়ার) বিষয়ে কিছু উল্লেখ নেই, হাদীসেও তোমার বিষয়ে কিছু আছে বলে আমি জানি না। তুমি ফিরে যাও, আমি লোকদের কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করি। তিনি লোকদের কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলেন তখন মুগিরা ইবনে শুবা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে উপস্থিত ছিলাম, তিনি দাদীকে এক ষষ্ঠমাংস দিয়েছেন। আবু বকর রা. বলেন, তুমি ছাড়া আর কেউ কি বিষয়টি জানে? তখন মুহাম্মাদ ইবনে সালামা দাঁড়ালেন এবং মুগিরা যেমন বলেছেন তেমন বললেন। … সুনানু তিরমিযী, হাদীস নং ২১০১; সুনানু আবু দাউদ, হাদীস নং ২৮৯৬।হাদীসটির সকল বর্ণনাকারীকেই মুহাদ্দিসগণ ছিকাহ বলেছেন। হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী হাসান সহীহ বলেছেন। তবে ক্ববিসা আবু বকর রা. পেয়েছেন কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। হাদীসটির উপর আমল সহীহ হওয়ার বিষয়ে সকল আলেম একমত।
৩। عَنْ عَائِشَةَ أَنَّهَا أَخْبَرَتْهُ أَنَّ فَاطِمَةَ بِنْتَ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- أَرْسَلَتْ إِلَى أَبِى بَكْرٍ الصِّدِّيقِ تَسْأَلُهُ مِيرَاثَهَا مِنْ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- مِمَّا أَفَاءَ اللَّهُ عَلَيْهِ بِالْمَدِينَةِ وَفَدَكٍ وَمَا بَقِىَ مِنْ خُمْسِ خَيْبَرَ فَقَالَ أَبُو بَكْرٍ إِنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ لاَ نُورَثُ مَا تَرَكْنَا صَدَقَةٌ إِنَّمَا يَأْكُلُ آلُ مُحَمَّدٍ – -صلى الله عليه وسلم- – فِى هَذَا الْمَالِ وَإِنِّى وَاللَّهِ لاَ أُغَيِّرُ شَيْئًا مِنْ صَدَقَةِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- عَنْ حَالِهَا الَّتِى كَانَتْ عَلَيْهَا فِى عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- وَلأَعْمَلَنَّ فِيهَا بِمَا عَمِلَ بِهِ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فَأَبَى أَبُو بَكْرٍ أَنْ يَدْفَعَ إِلَى فَاطِمَةَ شَيْئًا فَوَجَدَتْ فَاطِمَةُ عَلَى أَبِى بَكْرٍ فِى ذَلِكَ – قَالَ – فَهَجَرَتْهُ فَلَمْ تُكَلِّمْهُ حَتَّى تُوُفِّيَتْ
উরবা ইবনে যুবায়রে র্বণনা করছেনেৃ আয়শা হতে র্বণতি ফাতমিা রাসুলুল্লাহ-এর সম্পদ হতে তার প্রাপ্য মীরাছ এর দাবী করে আবু বকর এর নকিট পাঠালনে, যা আল্লাহ তালা রাসুলুল্লাহ কে মদীনা ও ফদিাক এর ফাই এবং খায়বাররে অবশষ্টি এক-পঞ্চমাংশ হতে প্রদান করছেলিনে। তখন আবু বকর বললনে, রাসুলুল্লাহ বলে গয়িছেনে, আমাদরে নবীদরে পরত্যিক্ত সম্পদে কোন মীরাছ বন্টন করা হবে না। কনেনা আমাদরে রাখয়িা যাওয়া সকল কছিু ছদকা হয়ে যাব। মোহাম্মদ এর পরবিারর্বগ তা হতে ভরণ পোষণ গ্রহণ করব। আমি আল্লাহর শপথ করে বলতছে, মুহাম্মদ এর আমলে ছদকাহর যে ব্যবস্থা জারী ছলি, তা আমি পরর্বিতন করব না। এই ব্যপারে আমি সইে কাজই করব যা রাসুলুল্লাহ করে গয়িছেনে। অতএব আবু বকর ফাতমিা কে তা হতে মীরাছ প্রদান করতে অস্বীকার করলনে। যার ফলে ফাতমো রাগান্বতি হয়ে আবু বকর এর সাথে সংস্রব ত্যাগ করলনে। তনিি মৃত্যূ র্পযন্ত তার সাথে আর কোন কথাই বলনে নাই। … সহীহ মুসলমি, হাদীস নং ৪৬৭৯। আমরা প্রথম হাদীসে দেখছি, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন তিনবার অনুমতি চাওয়ার পর অনুমতি না দিলে ফিরে যাও এটা উমার রা. জানতেন না। আবু মুসা রা. যখন বললেন তখন তিনি তাঁকে এর স্বপক্ষে সাক্ষী হাজির করতে বললেন। তিনি বলেন নি দাঁড়াও আমি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছ থেকে বিষয়টি জেনে নিই। যদি মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছ থেকে কোন কিছু জেনে নেয়া সম্ভব হতো তাহলে উমার রা. তাই করতেন। একজন প্রথম সারীর সাহাবীর পক্ষে যখন এটা সম্ভব নয় তখন কোন ওলীর পক্ষে কি এটা সম্ভব? দ্বিতীয় হাদীসে আমরা দেখছি, দাদীর মিরাছ পাওয়া বিষয়ে আবু বকর রা. জানা ছিল না। যখন একজন দাদী মিরাস দাবী করল তখন তিনি বললেন, আমি লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করে দেখি। যদি মৃত্যুর পর রাসূলুল্লাহ সা. এর সাথে কথা বলার সুযোগ থাকতো তাহলে তো তিনি বলতেন, দাঁড়াও, আমি রাসূলুল্লাহ সা. এর কাছে শুনে দেখি। আবু বকরের মত সাহাবী, ইসলামের প্রথম খলীফার পক্ষে মৃত্যুর পরে রাসূলের সাথে কথা বলা যেখানে অসম্ভব সেখানে কোথায় ওলী আর কোথায় মুরশিদ? এভাবে তৃতীয় হাদীস থেকে আমরা বুঝতে পারি, ফাতিমা রা.কে মিরাস দিতে অস্বীকার করায় তিন আবু বকর রা. এর সাথে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দেন। তার অর্থ হলো ফাতেমা রা. মনে করতেন তিনি মিরাসের হকদার। কিন্তু তিনি কখনো তো রাসূলুল্লাহ সা. এর কবরের কাছে গিয়ে জানতে গেলেন না মিরাস পাবেন কিনা? তিনি তো রাসূলুল্লাহ সা. এর সবচেয়ে আদরের মেয়ে ছিলেন। তাহলে কি রাসূলের কাছে ফাতেমার চেয়েও ঐসব কথিত পীর-মুরশিদ বেশী প্রিয়? উপরের আলোচনা থেকে আশা করি বুঝতে পেরেছেন, রাসূলুল্লাহ সা. এর ওফাতের পরে কোন বিষয়ে তার সাথে আলোচনা করার দাবী করা সম্পূর্ণ ভন্ডামী, কুসংস্কার ও মিথ্যা কথা। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই ধরনের পীর-মুরশিদ থেকে হেফাজত করুন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম।
শায়খ রা. মারা যাওয়ার পূর্বে এই প্রশ্নের বিষয়ে আমি তাঁর সাথে আলোচনা করেছিলাম। তিনি যা বলেছেন তার সারকথা হলো: ইসলাম আমাদের দেশে দুই ধরনের।একটি কথিত ওলী-আউলিয়াদের বাণী নির্ভর ইসলাম আর একটি হলো কুরআন-সুন্নাহ নির্ভর ইসলাম। আপনি যদি প্রথম প্রকারের ইসলাম মানেন তাহলে এই প্রশ্নের বিষয়ে আপনার সাথে আমাদের কোন কথা নেই আর যদি দ্বিতীয় প্রকারের ইসলাম মানেন অর্থাৎ কুরঅঅন-সুন্নাহ নির্ভর ইসলাম মানেন তাহলে লক্ষ্য করুন: তিনি কুরআন-সুন্নাহর আলোকে ইসলামী আকীদা বইয়ের ৪৩০ পৃষ্ঠা বলেছেন, আল্লাহ কাউকে কোনরূপ ক্ষমতা প্রদান করেন নি। মহান আল্লাহ সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন যে, তিনি কখনোই কাউকে এরূপভাবে ক্ষমতা দেন নি। মহান আল্লাহ বলেন:
وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُنْ لَهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ وَلِيٌّ مِنَ الذُّلِّ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا
বল, প্রশংসা আল্লাহরই যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেন নি, তাঁরা ক্ষমতায়-রাজত্বে কোনো শরীক নেই এবং যিনি দুর্দশাগ্রস্ত হন না যে- কারণে তাঁর অভিভাবকের বা সাহায্যকারীর প্রয়োজন হতে পারে। সুতরাং সসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা কর। সূরা (১৭) বানী ইসরাঈল: ১১১ আয়াত। আরো দেখুন: সূরা (১৮) কাহাফ: ২৬ ও সূরা (১৩) রাদ: ৪১ আয়াত। এক আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ لا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلا فِي الأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِنْ شِرْكٍ وَمَا لَهُ مِنْهُمْ مِنْ ظَهِيرٍ
বল, তোমরা আহ্বান কর তাদেরকে যাদেরকে তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে (ইলাহ) মনে করতে, তারা আকাশ-মণ্ডলী এবং পৃথিবীতে অণুপরিমাণ কিছুর মালিক নয় এবং এতদুভয়ে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের কেউ মহান আল্লাহর সহায়কও নয়। সূরা (৩৪) সাবা: ২২ আয়াত। এ বিষয়টি সকল মুশরিকের সকল উপাস্যের বিষয়েই প্রযোজ্য। মুর্তি, প্রতিমা, তারকা, ফিরিশতাগণ, নবীগণ, ওলীগণ, জিন্নগণ বা অন্য যাদেরই ইবাদত করত মুশরিকগণ সকলের ক্ষেত্রেই উত্তর একই। তাঁরা কেউই আসমানের বা যমিনের এক অনুপরিমাণ মালিকানা রাখেন না। আসমান-যমিনের কোথাও তাদের কোনো অংশীদারিত্ব নেই এবং মহান আল্লাহ তাদের কারো সহযোগিতার প্রত্যাশী নন, কেউ তাকে কোনোরূপে সাহায্য সহযোগিতা করেন না। অন্য আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন:
ذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِنْ دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِنْ قِطْمِيرٍ
তিনিই আল্লাহ তোমাদের প্রতিপালক। রাজত্ব-মালিকানা তাঁরই। এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো খেজুরের আঁটির আবরণেরও মালিক নয়। সূরা (৩৫) ফাতির: ১৩ আয়াত। খৃস্টানগণ ঈসা মাসীহ (আ)-কে মহান আল্লাহর যাত বা সত্তার অংশ ও অবতার (এড়ফ রহপধৎহধঃব) হিসেবে ইবাদত করে। এ ছাড়া তারা মরিয়ম (আ)-কে সান্তা বা মহান আল্লাহর বিশেষ করুণাপ্রাপ্ত ওলী হিসেবে ইবাদত করে। তার মুর্তিতে বা ফিলিস্তিনে বিদ্যমান তার কবরে সাজদা করে, মানত করে, তার আশীর্বাদ ও বর প্রার্থনা করে। মহান আল্লাহ তাদেরকে বিশ্ব পরিচালনায় কিছু ক্ষমতা দিয়েছেন বলে তারা বিশ্বাস করে। মহান আল্লাহ তাদের মানবত্ব ও অক্ষমতা বর্ণনা করে বলেন:
مَا الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ إِلا رَسُولٌ قَدْ خَلَتْ مِنْ قَبْلِهِ الرُّسُلُ وَأُمُّهُ صِدِّيقَةٌ كَانَا يَأْكُلانِ الطَّعَامَ انْظُرْ كَيْفَ نُبَيِّنُ لَهُمُ الآَيَاتِ ثُمَّ انْظُرْ أَنَّى يُؤْفَكُونَ قُلْ أَتَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ مَا لا يَمْلِكُ لَكُمْ ضَرًّا وَلا نَفْعًا وَاللَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ
মরিয়ম-তনয় মাসীহ তো কেবল একজন রাসূল; তার পূর্বে বহু রাসূল গত হয়েছে এবং তার মাতা সত্যনিষ্ঠ ছিল। তারা উভয়ে খাদ্যাহার করত। দেখ, তাদের জন্য আয়াত কিরূপ বিশদভাবে বর্ণনা করি, আরো দেখ, তারা কিভাবে সত্য বিমুখ হয়! বল, তোমরা কি আল্লাহ ব্যতীত এমন কিছুর ইবাদত কর যার কোনোই ক্ষমতা নেই তোমাদের ক্ষতি করার বা উপকার করার? আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। সূরা (৫) মায়িদা: ৭৫-৭৬ আয়াত। উক্ত আলোচনা থেকে আমরা বুঝতে পারি আল্লাহ তায়ালা কোন ওলী বা কোন ব্যক্তিকে এমন কোন ক্ষমতা প্রদান করেন নি যার মাধ্যমে সে মৃত থাকা অবস্থায় স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে কাউকে কোন ধরনের সাহায্য করতে পারে। বরং এই ধরনের সাহায্য আল্লাহ তায়ালার কাজ। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চাওয়া সম্পর্কে তিনি উক্ত বইয়ের ৪০৩ ও ৪৯৮ পৃষ্ঠায় বলেন, প্রার্থনা করা বা ডাকার বিষয়বস্তু দুই প্রকারের হতে পারে। এক প্রকার লৌকিক বা জাগতিক সাহায্য-সহযোগিতা যা মানুষ স্বাভাবিকভাবে করতে পারে। এ সকল বিষয় প্রকৃতিগতভাবে একজন মানুষ আরেকজনের নিকট চেয়ে থাকে এবং মানুষ জাগতিকভাবে তা প্রদান করতে পারে। যেমন, কারো কাছে টাকাপয়সা চাওয়া, সাহায্য চাওয়া, পানিতে পড়ে গেলে উঠানোর জন্য সাহায্য চাওয়া, মাথার বোঝা পড়ে গেলে উঠাতে সাহায্য চাওয়া, ইত্যাদি, ইত্যাদি অগণিত। জাতি, ধর্ম, বিশ্বাস ও অবিশ্বাস নির্বিশেষে সকলেই এ ধরনের সাহায্য প্রার্থনা করে। দ্বিতীয় প্রকার প্রার্থনা বা ডাকা অলৌকিক বা অপার্থিব। জাগতিক মাধ্যম ও উপকরণ ছাড়া অলৌকিক সাহায্য, ত্রাণ ইত্যাদি প্রার্থনা করা। এ জাতীয় প্রার্থনা শুধুমাত্র কোনো ধর্মের অনুসারী বা বিশ্বাসী করেন। বিশ্বাসী কেবলমাত্র আল্লাহ ঈশ্বর বা সর্বশক্তিমান বলে যাকে বিশ্বাস করেন, অথবা যার সাথে ইশ্বরের বিশেষ সম্পর্ক ও যার মধ্যে ঐশ্বরিক ক্ষমতা আছে, তার কাছেই এরূপ প্রার্থনা করেন বা তাকেই এভাবে ডাকেন। দৃশ্যমান বা অদৃশ্য উপস্থিত কোনো মানুষ, জিন্ন বা ফিরিশতার কাছে লৌকিক ও জাগতিক সাহায্য ও ত্রাণ প্রার্থনা করা যায়। কিন্তু অলৌকিক ত্রাণ একমাত্র মহান আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে চাওয়া যায় না। দূরে অবস্থিত বা অনুপস্থিত কারো কাছে লৌকিক বা অলৌকিক সাহায্য চাওয়া এবং উপস্থিত বা অনুপস্থিত কারো কাছে অলৌকিক সাহায্য চাওয়া শিরক। নুমান ইবনু বাশীর (রা) বলেন, নবীজী বলেন : الدُّعَاءُ هُوَ الْعِبَادَةُ দুআ বা প্রার্থনাই ইবাদত। একথা বলে তিনি কুরআনের আয়াত পাঠ করলেন (সূরা গাফির (মুমিন) : ৬০):
وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ
তোমাদের প্রভু বলেন: তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিব বা তোমাদের প্রার্থনা পূরণ করব। নিশ্চয় যারা আমার ইবাদত থেকে অহঙ্কার করে (আমার কাছে প্রার্থনা না করে) তারা শীঘ্রই লাঞ্ছিত অপমানিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তিরমিযী, আস-সুনান ৫/২১১; আবু দাউদ, আস-সুনান ২/৭৬; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ২/১২৫৮; ইবনু হিব্বান, আস-সুনান ৩/১৭২; হাকিম, আল-মুসতাদরাক ১/৬৬৭। হাদীসটি সহীহ। দুআ, কেন্দ্রিক শিরকের বিষয়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলবী (রাহ) বলেন: মুশরিকগণ আল্লাহ ছাড়া অন্যদের নিকট হাজত বা প্রয়োজন মেটানোর জন্য সাহায্য প্রার্থনা করত। অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থতা, দরিদ্র ব্যক্তির সচ্ছলতা ইত্যাদি প্রয়োজনে তারা তাদের নিকট প্রার্থনা করত। এ সকল উদ্দেশ্য পূরণ হওয়ার জন্য তারা তাদের নামে মানত করত। তারা আশা করত যে, এ সকল মানতের মাধ্যমে তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে এবং বিপদাপদ কেটে যাবে। তারা বরকত লাভের উদ্দেশ্যে এ সকল উপাস্যের নাম পাঠ করত। একারণে আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিলেন যে, তারা সালাতের মধ্যে বলবে: إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ আমরা শুধু তোমরই ইবাদত করি, শুধু তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি। সূরা (১) ফাতিহা: ৪ আয়াত। মহান আল্লাহ বলেন: فَلا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেক না। সূরা (৭২) জিন্ন: ১৮ আয়াত। একটি উদাহরণ থেকে আমরা লৌকিক ত্রাণ প্রার্থনা বা ডাকা এবং শিরকী ত্রাণ প্রার্থনা বা ডাকার মধ্যে পার্থক্য বুঝার চেষ্টা করি। মনে করুন আমার গরুটি পালিয়ে যাচ্ছে। আমি সামনে কোনো মানুষ দেখে বা কোনো মানুষ থাকতে পারে মনে করে চিৎকার করে বললাম, ভাই, আমার গরুটি একটু ধরে দেবেন! অথবা আমি পথ চিনতে পারছি না, তাই কোনো মানুষকে দেখে অথবা কোনো বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে ভিতরে মানুষ আছে অনুমান করে চিৎকার করে বলছি, ভাই অমুক স্থানে কোন দিক দিয়ে যাব একটু বলবেন! এখানে আমি লৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করছি। ঐ মানুষের মধ্যে কোনো অলৌকিকত্ব বা ঐশ্বরিক গুণ কল্পনা করছি না। ঐ ব্যক্তির ব্যক্তিগত পরিচয়ও আমার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। আমি জানি যে, স্বাভাবিকভাবে একজন মানুষ একটি গরু ধরতে পারে বা উক্ত স্থানের একজন বাসিন্দা স্বাভাবিকভাবে পথটি চিনবে বলে আশা করা যায়। এজন্য আমি তার থেকে এই লৌকিক সাহায্য প্রার্থনা করছি। যদি কোথাও এই প্রকারের জাগতিক সমস্যা হয় এবং সেখানে কোনো মানুষজন না থাকে তাহলে উপস্থিত অদৃশ্য ফিরিশতাগণের নিকটও সাহায্য চাওয়া যেতে পারে বলে একটি দুর্বল সনদের হাদীস থেকে জানা যায়। মুমিন জানেন যে, আল্লাহর অগণিত ফিরিশতাগণ পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছেন। এছাড়া অদৃশ্য সৃষ্টি জীনেরাও বিভিন্ন স্থানে চলাচল করে। উপরের পরিস্থিতিতে যদি কোনো দৃশ্যমান মানুষকে না দেখে তিনি অদৃশ্য ফিরিশতা বা জ্বিনের কাছে লৌকিক সাহায্য চান তাহলে তা জায়েয হবে। কারণ তিনি কোনো নির্দিষ্ট সৃষ্টির মধ্যে ঈশ্বরত্ব বা অলৌকিকত্ব কল্পনা করছেন না। তথায় কোন্ ফিরিশতা আছেন বা কোন্ জ্বিন রয়েছেন তাও তিনি জানেন না বা জানা তার কাছে কোনো গুরুত্ব বহন করে না। তিনি জানেন যে, এখানে কোনো ফিরিশতা বা জ্বিন থাকতে পারেন। আল্লাহর অন্য কোনো বান্দাকে দেখছি না, কাজেই এখানে উপস্থিত আল্লাহর অদৃশ্য বান্দাদের কাছে একটু সাহায্য চেয়ে দেখি কী হয়। ইবনু মাসঊদ (রা) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:
إِنَّ لِلهِ عَزَّ وَجَلَّ مَلاَئِكَةً سِوَى الْحَفَظَةِ يَكْتُبُوْنَ مَا سَقَطَ مِنْ وَّرَقِ الشَّجَرِ فَإِذَا أَصَابَ أَحَدَكُمْ عَرْجَةٌ بِأَرْضِ فَلاَةٍ فَلْيُنَادِ أَعِيْنُوا عِبَادَ اللهِ يَرْحَمُكُمُ اللهُ تَعَالَى
বান্দার সাথে তার সংরক্ষণে নিয়োজিত ফিরিশতাগণ ছাড়াও আল্লাহর অনেক ফিরিশতা আছেন যারা সারা বিশ্বে কোথায় কোন গাছের পাতা পড়ছে তাও লিখেন। যদি তোমাদের কেউ কোনো নির্জন প্রান্তরে আটকে পড়ে বা অচল হয়ে পড়ে তাহলে সে ডেকে বলবে: হে আল্লাহর বান্দাগণ তোমরা সাহায্য কর, আল্লাহ তোমাদের রহমত করুন। ইবনু আবী শাইবা, আল-মুসান্নাফ ৬/৯১, আবু ইয়ালা, আল-মুসনাদ ৯/১৭৭, তাবারানী, আল-মুজামুল কাবীর ১০/২১৭, ১৭/১১৭, বাইহাকী, শুআবুল ঈমান ১/১৩৮, ৬/১২৮, হাইসামী, মাজমাউয় যাওয়াইদ ১০/১৩২, মুনাবী, ফাইযুল কাদীর ১/৩০৭, শওকানী, তুহফাতুয যাকিরীন, পৃ. ১৫৫, আলবানী, যায়ীফাহ ২/১০৮-১১০, নং ৬৫৫, যায়ীফুল জামিয়, পৃ. ৫৫, ৫৮, নং ৩৮৩, ৪০৪। হাদীসটির সনদ যয়ীফ। এ প্রকার লৌকিক বা জাগতিক সাহায্য প্রার্থনা করার ক্ষেত্রে যদি কেউ অনুপস্থিত কাউকে ডাকেন বা অনুপস্থিত কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেন তাহলে তা শিরক হবে। যেমন, কারো রিকশা উল্টে গেছে বা গাড়িটি খাঁদে পড়েছে, তখন স্বাভাবিক লৌকিক কর্ম যে, সে কাউকে দেখতে পাক বা না পাক, সে চিৎকার করে সাহায্য চাইবে: কে আছ একটু সাহায্য কর। এখানে সে লৌকিক সাহায্য চাচ্ছে। কিন্তু যদি সে এ সময়ে সেখানে অনুপস্থিত কোনো জীবিত বা মৃত মানুষকে ডাকতে থাকে তাহলে সে শিরকে লিপ্ত হবে। কারণ সে মনে করছে, অনুপস্থিত অমুক ব্যক্তি সদা সর্বদা সবত্র বিরাজমান বা সদা সর্বদা সকল স্থানের সবকিছু তার গোচরিভূত। কাজেই, তিনি দূরবর্তী স্থান থেকে আমাকে দেখতে পাচ্ছেন বা আমার ডাক শুনতে পাচ্ছেন এবং দূর থেকে অলৌকিকভাবে আমার বিপদ কাটিয়ে দেওয়ার মতো অলৌকিক ক্ষমতা তার আছে। এভাবে সে একটি নির্দিষ্ট সৃষ্টির মধ্যে অলৌকেকত্ব, ঐশ্বরিক শক্তি বা মহান আল্লাহর গুণাবলী আরোপ করে শিরকে নিপতিত হয়েছে। এছাড়াও সে মহান আল্লাহর ক্ষমতাকে ছোট বলে মনে করেছে। এ প্রার্থনাকারী বা আহ্বানকারী ঐ বিশেষ ব্যক্তির মধ্যে যে ক্ষমতা কল্পনা করেছে তা একান্তভাবেই মহান আল্লাহর জন্য নির্ধারিত। এ প্রাথনাকারী এই গুণাবলীকে শুধুমাত্র আল্লাহর বলে মনে করে না। সে বিশ্বাস করে যে, এই ক্ষমতার মধ্যে আল্লাহর শরীক আছে। এই ক্ষমতাটি যেমন আল্লাহর আছে, তেমনি অমুক ব্যক্তিরও আছে। তবে সে সম্ভবত তার কল্পনার মানুষটির ক্ষমতাকে এ ক্ষেত্রে আল্লাহর ক্ষমতার চেয়ে বেশি বা দ্রুত বলে বিশ্বাস করে। এজন্যই সে আল্লাহকে না ডেকে তাকে ডেকেছে। এক্ষেত্রে মুশরিকদের দাবি যে, এ সকল খাজা বাবা, সাঁই বাবা, মা, সান্তা, সেন্ট, ফিরিশতা বা জ্বিনদেরকে আল্লাহই ক্ষমতা প্রদান করেছেন। ক্ষমতা মূলত আল্লাহরই, তিনি এদেরকে কিছু বা সকল ক্ষমতা প্রদান করেছেন। শিরকের হাকীকাত বিষয়ে শাহ ওয়ালি উল্লাহ (রাহ)-এর বক্তব্যে আমরা তা দেখেছি। উক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, মৃত কোন ওলীর কাছে কোন ধরনের সাহায্য চাওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে সুস্পষ্ট শিরক। উক্ত বক্তব্য তাঁরা দিয়েছেন কি না তা স্পষ্ট নয়। তবে যদি তাঁরা দিয়ে থাকেনও তাহলে আমরা বলবো মানুষ ভুলের উর্ধ্বে নয়। আমরা তাদের শ্রদ্ধা করি, ভালবাসি। আল্লাহ তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করে জান্নাত তাদের বাসস্থান বানান। আমীন।
হ্যঁ, আপনি সুন্নত-নফল সালাতের সাজাদর মধ্যে কুরআন-হাদীসরে দুআ পড়তে পারেন।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম। স্যার রহ. বেঁচে থাকা কালীন কিছু ব্যক্তিকে প্রশ্নের উত্তর লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। যারা উত্তর লিখে স্যার রহ. কে দেখাতেন, কোন সমস্যা থাকলে তিনি ঠিক করে দিতেন আর না থাকলে সেভাবেই রেখে দিতেন। বর্তমানে আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। তবে যে প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা পরিলক্ষিত হবে সে ক্ষেত্রে ট্রাস্টের পক্ষ একটি কমিটি করে দেয়া হয়েছে, যাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে হবে। উক্ত কমিটিতে আছেন, মুফতি জাকারিয়া বিন আব্দুল ওয়াহাব, বিভাগীয় প্রধান, উলুমুল হাদীস বিভাগ, জামিয়াতুস সুন্নাহ, ঝিনাইদহ এবং মুফতি মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহ, বিভাগীয় প্রধান, কিতাব বিভাগ, জামিয়াতুস সুন্নাহ, ঝিনাইদহ। এছাড়া অন্য কোথাও হতে সাহায্য নেয়া হলে তার পরিচিতি উত্তরের শেষে দেয়া হয়। যেমনটি আপনি আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরের ক্ষেত্রে দেখতে পাবেন। আল্লাহ তায়ালার কোন নাম ধরে ১০০ বার বা ৭০ বার জিকির করার কোন ফজিলত হাদীসে নেই। আর শুধু আল্লাহর বিভিন্ন নাম ধরে যেমন, ইয়ার রাহিমু, ইয়া রাহমানু ইত্যদি বলে জিকির করা যাবে না। এভাবে যিকির করা মর্মে কোন হাদীস বর্ণিত হয় নি। তবে কেউ এভাবে আল্লাহকে ডাকলে জায়েজ হবে। দেখুন আল-ইসলাম সুয়াল ও জাওয়াব, শায়খ মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ, ফাতওয়া নং ১২৭৩১৬, ২২৪৫৭।
ওয়া আলাইকুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটি করার জন্য আপনাকে মুবারকবাদ। মহান আল্লাহর বিশেষণ বিষয়ে চার ইমামসহ পূর্ববর্তী ইমামগণের মূলণীতি হলো কুরাআন ও হাদীসে মহান আল্লাহর বিষয়ে যা বলা হয়েছে তা সরল অর্থে বিশ্বাস করা, তুলনা ও ব্যাখ্যা বর্জন করা। বিষয়টি বিস্তারিত জানতে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) রচিত আলি-ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা বইটি পড়তে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি। এখানে মহান আল্লাহর আরশের উপর ইসতিওয়া প্রসঙ্গটি উল্লেখ করছি। কুরআনে সাত স্থানে বলা হয়েছে যে, মহান আল্লাহ আরশের উপর ইসতিওয়া করেছেন।আরবীতে কোনো কিছুর উপর ইসতিওয়া অর্থ তার ঊর্ধ্বে অবস্থান (rise over, mount, settle)। সালাতের নিষিদ্ধ সময় বর্ণনা করে রাসূলুল্লাহ (সা.) একজন প্রশ্নকারীকে বলেন:
حَتَّى تَسْتَوِىَ الشَّمْسُ عَلَى رَأْسِكَ كَالرُّمْحِ ، فَإِذَا اسْتَوَتْ عَلَى رَأْسِكَ كَالرُّمْحِ فَدَعِ الصَّلاَةَ
(সালাত বৈধ থাকবে) যতক্ষণ না সূর্য তোমার মাথার উপরে তীরের মত ইসতিওয়া (ঊর্ধ্বে অবস্থান) করবে। যখন সূর্য তোমার মাথার উপর তীরের মত ইসতিওয়া (ঊর্ধ্বে অবস্থান) করবে তখন সালাত পরিত্যাগ করবে। আমরা ইসতিওয়া-র অনুবাদে উপরে অবস্থান বা অধিষ্ঠান শব্দ ব্যবহার করব, ইনশা আল্লাহ। জাহমী-মুতাযিলীগণ এ বিশেষণ অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেন, আরশের উপরে অধিষ্ঠান কোনোভাবেই মহান আল্লাহর বিশেষণ হতে পারে না; কারণ মহান আল্লাহর জন্য এভাবে অবস্থান পরিবর্তন বা কোনো কিছুর উপরে স্থিতি গ্রহণের মত মানবীয় কর্ম অশোভনীয় এবং তাঁর অতুলনীয়ত্বের সাথে সাংঘর্ষিক। এছাড়া মহান আল্লাহ বলেছেন যে, তিনি বান্দার সাথে ও নিকটে।কাজেই তিনি আরশের উপর থাকতে পারেন না। বরং তাঁরা দাবি করেন যে, মহান আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান; তাঁকে কোনো স্থান বা দিকে সীমাবদ্ধ করা তাঁর অতুলনীয়ত্বের পরিপন্থী। তারা দাবি করেন, আরশে অধিষ্ঠান গ্রহণের অর্থ আরশের নিয়ন্ত্রণ, দখল বা ক্ষমতা গ্রহণ। সাহাবী, তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী ইমামগণ মহান আল্লাহর আরশের উপর অধিষ্ঠান বা ইসতিওয়ার বিশেষণটি সরল অর্থে গ্রহণ করেছেন। দ্বিতীয় হিজরী শতক থেকেই তাবিয়ী ও তাবি-তাবিয়ী ইমামগণ এবং পরবর্তী মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ জাহমীগণের এ মত কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং একে কুরআন অস্বীকার বলে গণ্য করেছেন। এ বিষয়ে তাঁরা বলেন: মহান আল্লাহর আরশের উপরে অবস্থান বা আরশের ঊর্ধ্বে থাকার বিশেষণটি কুরআন ও হাদীস দ্বারা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণিত। তবে এর প্রকৃতি ও স্বরূপ অজ্ঞাত। অজ্ঞাতকে অজ্ঞাত রেখে কুরআনের অন্যান্য বক্তব্যের ন্যায় এ বক্তব্যও স্বীকার ও বিশ্বাস করা মুমিনের জন্য জরুরী। তাঁরা বলেন: মহান আল্লাহ আরশের উপর অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন। তাঁর এ অধিষ্ঠান বা অবস্থানের স্বরূপ আমরা জানি না এবং জানতে চেষ্টাও করি না। বরং বিশ্বাস করি যে, তাঁর এ অধিষ্ঠান কোনোভাবেই কোনো সৃষ্টির বিশেষণ বা কর্মের মত নয়। তাঁর অতুলনীয়ত্বের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অবস্থান তিনি গ্রহণ করেন। যখন মানুষ কল্পনা করে যে, মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির মতই; তিনি একই সাথে আরশের উপরে এবং বান্দার নিকটবর্তী হতে পারেন না- তখনই কুরআনের এ দুটি নির্দেশনার মধ্যে বৈপরীত্য আছে বলে কল্পনা হয়। মূল বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মহান আল্লাহ সৃষ্টির মত নন। কাজেই নৈকট্য ও ঊর্ধ্বত্ব উভয়কে সমানভাবে বিশ্বাস করে এর স্বরূপ ও প্রকৃতি আল্লাহর উপর ন্যস্ত করলে কুরআনের সকল নির্দেশনা বিশ্বাস ও মান্য করা হয়। আর নৈকট্যের অজুহাতে তাঁকে সর্বত্র বিরাজমান বলে দাবি করলে, তিনি কোথায় আছেন তা জানি না বলে দাবি করলে, আরশ কোথায় তা জানি না বলে দাবি করলে বা তাঁর আরশের উপর অধিষ্ঠানের আয়াতগুলো ব্যাখ্যার নামে অস্বীকার করলে কুরআন ও হাদীসের অগণিত বক্তব্য অস্বীকার করা হয়, যা কুফরীর নামান্তর। ইমাম আবূ হানীফা রহিমাহুল্লাহ তাঁর ওসীয়াত গ্রন্থে লিখেছেন:
نُقِرُّ بِأَنَّ اللهَ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى، مِنْ غَيْرِ أَنْ يَكُوْنَ لَهُ حَاجَةٌ إِلَيْهِ وَاسْتِقْرَارٌ عَلَيْهِ، وَهُوَ الْحَافِظُ لِلْعَرْشِ وَغَيْرِ الْعَرْشِ، فَلَوْ كَانَ مُحْتَاجاً إِلَيْهِ لَمَا قَدِرَ عَلَى إِيْجَادِ الْعَالَمِ وَتَدْبِيْرِهِ كَالْمَخْلُوْقِين، وَلَوْ صَارَ مُحْتَاجاً إِلَى الْجُلُوْسِ وَالْقَرَارِ فَقَبْلَ خَلْقِ الْعَرْشِ أَيْنَ كَانَ اللهُ تَعَالَى؟ فَهُوَ مُنَزَّهٌ عَنْ ذَلِكَ عُلُوًّا كَبِيْراً
আমরা স্বীকার ও বিশ্বাস করি যে, মহান আল্লাহ আরশের উপর অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন, আরশের প্রতি তাঁর কোনোরূপ প্রয়োজন ব্যতিরেকে এবং আরশের উপরে স্থিরতা-উপবেশন ব্যতিরেকে। তিনি আরশ ও অন্য সবকিছুর সংরক্ষক। তিনি যদি আরশের মুখাপেক্ষী হতেন তাহলে বিশ্ব সৃষ্টি করতে ও পরিচালনা করতে পারতেন না, বরং তিনি মাখলূকের মত পরমুখাপেক্ষী হতেন। আর যদি তাঁর আরশের উপরে উপবেশন করার প্রয়োজনীয়তা থাকে তবে আরশ সৃষ্টির পূর্বে তিনি কোথায় ছিলেন? কাজেই আল্লাহ এ সকল বিষয় থেকে পবিত্র ও অনেক অনেক ঊর্ধ্বে। ইমাম আযমের এ বক্তব্য উল্লেখ করে মোল্লা আলী কারী হানাফী বলেন: এ বিষয়ে ইমাম মালিক (রাহ) খুবই ভাল কথা বলেছেন। তাঁকে আল্লাহর আরশের উপরে ইসিতিওয়া বা অধিষ্ঠান বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন:
اَلاِسْتِوَاءُ مَعْلُوْمٌ وَالْكَيْفُ مَجْهُوْلٌ وَالسُّؤَالُ عَنْهُ بِدْعَةٌ وَالإِيْمَانُ بِهِ وَاجِبٌ
ইসতিওয়া বা অধিষ্ঠান পরিজ্ঞাত, এর পদ্ধতি বা স্বরূপ অজ্ঞাত, এ বিষয়ে প্রশ্ন করা বিদআত এবং এ বিষয় বিশ্বাস করা জরুরী। ইমাম সায়িদ নাইসাপূরী হানাফী বলেন:
حكي عن أبي حنيفة t في رسالته إلى مقاتل بن سليمان جواب كتابه، في فصل منها: وأما قوله تعالى على العرش استوى حقا، فإنّما ننتهي من ذلك إلى ما وصف كتابُ ربنا في قوله تعالى {ثم استوى على العرش}، وتَعْلَمَنَّ أنه كما قال، ولا ندعي في استوائه على العرش علما، ونزعم أنه قد استوى، ولا يشبه استواؤه باستواء الخلق، فهذا قولنا في الاستواء على العرش
ইমাম আবূ হানীফা থেকে বর্ণিত, তিনি (তাঁর সমসাময়িক দেহে বিশ্বাসী মুফাস্সির) মুকাতিল ইবন সুলাইমান (১৫০ হি)-এর পত্রের উত্তরে লেখা তাঁর পত্রের একটি অনুচ্ছেদে লিখেন: মহান আল্লাহ বলেছেন: তিনি আরশের উপর ইসিতওয়া (অধিষ্ঠান বা অবস্থান) গ্রহণ করেছেন। সত্যই তিনি তা করেছেন। আমাদের রবের কিতাব এ বিষয়ে যা বর্ণনা করেছেন সেখানেই আমরা থেমে যাই। আল্লাহ বলেছেন: অতঃপর তিনি আরশের উপর অধিষ্ঠান গ্রহণ করলেন। আপনি নিশ্চিত জানুন যে, তিনি যা বলেছেন বিষয়টি তা-ই। আমরা তাঁর অধিষ্ঠান বিষয়ে কোনো জ্ঞানের দাবি করি না। আমরা মনে করি তিনি অধিষ্ঠান গ্রহণ করেছেন এবং তাঁর অধিষ্ঠান সৃষ্টির অধিষ্ঠানের অনুরূপ বা তুলনীয় নয়। আরশের উপর অধিষ্ঠানের বিষয়ে এটিই আমাদের বক্তব্য। আমরা বলেছি, মহান আল্লাহর আরশের ঊর্ধ্বে থাকা অস্বীকার করার জন্য জাহমী-মুতাযিলীগণ তাঁর নৈকট্য বিষয়ক আয়াতগুলোকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করে দাবি করতেন যে, তিনি আত্মার মত বা বাতাসের মত। আত্মা যেমন দেহের সর্বত্র বিদ্যমান এবং বাতাস যেমন পৃথিবীর সর্বত্র বিদ্যমান তেমনি মহান আল্লাহ সৃষ্টি জগতের সর্বত্র বিরাজমান। এভাবে তাঁরা আল্লাহকে অতুলনীয় বলে প্রমাণ করার দাবিতে তাঁকে আত্মা ও বাতাসের সাথে তুলনা করতেন। উপরন্তু তারা তাঁকে সৃষ্টির অংশ বানিয়ে ফেলেন। বিশ্বজগত সৃষ্টির পূর্বে মহান আল্লাহ তাঁর অনাদি সত্তায় বিদ্যমান ছিলেন। তিনি তাঁর সত্তার বাইরে ও নিম্নে বিশ্বজগত সৃষ্টি করেন। তাঁর সত্তা বিশ্বজগতের সর্বত্র বিরাজমান বলার অর্থ একথা দাবি করা যে, মহান আল্লাহ বিশ্ব জগতকে তাঁর সত্তার অভ্যন্তরে সৃষ্টি করেছেন!! অথবা বিশ্ব জগত সৃষ্টির পরে তিনি এর অভ্যন্তরে সর্বত্র প্রবেশ করেছেন!!! এগুলো সবই মহান আল্লাহর নামে ওহী-বহির্ভুত বানোয়াট অশোভনীয় ধারণা। আল্লাহর সত্তা যেমন সৃষ্টির মত নয়, তেমনি তাঁর বিশেষণাবলিও সৃষ্টির মত নয়। সকল মানবীয় কল্পনার ঊর্ধ্বে তাঁর সত্তা ও বিশেষণ। কাজেই মহান আল্লাহর আরশের উপরে অধিষ্ঠান এবং বান্দার নৈকট্য উভয়ই সত্য এবং মুমিন উভয়ই বিশ্বাস করেন। উভয়ের মধ্যে বৈপরীত্য কল্পনা করা মানবীয় সীমাবদ্ধতার ফসল। তদুপরি জাহমীদের এ বিভ্রান্তি দূর করতে ইমামগণ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম মালিক বলেন:
الله في السماء وعلمه في كل مكان لا يخلو من علمه مكان
আল্লাহ আসমানে (ঊর্ধ্বে) এবং তাঁর জ্ঞান সকল স্থানে। কোনো স্থানই মহান আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। ইমাম আযম আবূ হানীফা থেকেও অনুরূপ বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন ইমাম বাইহাকী।এ প্রসঙ্গে পঞ্চম হিজরী শতকের প্রসিদ্ধ মালিকী ফকীহ ও মুহাদ্দিস ইবন আব্দুল র্বার ইউসুফ ইবন আব্দুল্লাহ (৪৬৩ হি) বলেন:
علماء الصحابة والتابعين الذين حملت عنهم التآويل في القرآن قالوا في تأويل هذه الآية هو على العرش وعلمه في كل مكان وما خالفهم في ذلك أحد يحتج بقوله
সাহাবী-তাবিয়ী আলিমগণ, যাদের থেকে কুরআনের ব্যাখ্যা গ্রহণ করা হয়েছে, তারা এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তিনি আরশের উপরে এবং তাঁর জ্ঞান সর্বত্র। দলিল হিসেবে গ্রহণ করার মত একজন আলিমও তাঁদের এ মতের বিরোধিতা করেন নি। ইমামদ্বয়ের বক্তব্য থেকে সুস্পষ্ট যে, ইসতিওয়া শব্দটিকে তাঁরা সাধারণ আরবী অর্থেই গ্রহণ করেছেন। মহান আল্লাহর ক্ষেত্রে এ শব্দটির অর্থ অস্পষ্ট, দ্ব্যর্থবোধক, মুতাশাবিহ, রূপক বা অজ্ঞাত বলে দাবি করেন নি। বরং তাঁরা বলেছেন যে, এ শব্দটির অর্থ জ্ঞাত বিষয়, এর মধ্যে কোনো অস্পষ্টতা, রূপকতা বা দ্ব্যর্থতা নেই। অর্থাৎ আরবী ভাষায় অন্যন্য সকল ক্ষেত্রে ইসতিওয়া আলা বলতে যা বুঝানো হয় এখানেও সেই অর্থই গ্রহণ করতে হবে, অর্থাৎ ঊর্ধ্বত্ব। এখানে অর্থটি রূপক বা অজ্ঞাত বলে দাবি করার সুযোগ নেই। তবে ইসতিওয়ার স্বরূপ বা ব্যাখ্যা অজ্ঞাত (মুতাশাবিহ)। এ অজ্ঞাত বিষয়ের জ্ঞান আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়ে জ্ঞাত বিষয়কে বিশ্বাস করাই মুমিনের দায়িত্ব। কুরআন কয়েকটি বিষয় আমাদেরকে জানায়: (১) মহান আল্লাহ অনাদি অনন্ত, কোনো কিছুর মুখাপেক্ষী নন এবং সবই তাঁর মুখাপেক্ষী, (২) মহান আল্লাহ কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নন, (৩) মহান আল্লাহ সৃষ্টির এক পর্যায়ে আরশ সৃষ্টি করেন এবং আরশের উপর অধিষ্ঠান গ্রহণ করেন এবং (৪) মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার নিকটবর্তী। সাহাবীগণ বিষয়গুলো সবই সরল অর্থে বিশ্বাস করেছেন এবং এ বিষয়ে কোনো বৈপরীত্য অনুভব করেন নি। কারণ আল্লাহর অমুখাপেক্ষী হওয়া, অতুলনীয় হওয়া, নিকটবর্তী হওয়া এবং আরশের উপর অধিষ্ঠিত হওয়া কোনোটিই মানবীয় বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক নয় বা অসম্ভব নয়। কাজেই ওহীর মাধ্যমে যা আল্লাহ জানিয়েছেন তা নিয়ে বিতর্ক করা বিভ্রান্তি বৈ কিছুই নয়। সমস্যার শুরু হয় যখন মানুষ এগুলোর গভীর স্বরূপ সন্ধানে ব্যস্ত হয়। আল্লাহ যদি অমুক্ষাপেক্ষী হন তাহলে আরশের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠানের দরকার কি? আরশের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠান গ্রহণ না করলে এ কথা বারবার বলার দরকার কী? অধিষ্ঠান অর্থ যদি ক্ষমতা গ্রহণ হয় তবে কাকে হটিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করলেন? শুধু আরশের ক্ষমতা গ্রহণের অর্থ কী? এরূপ জিজ্ঞাসা মানুষকে বিভ্রান্ত করে। এসবের সহজ সমাধান ওহীর সবগুলো বিষয় সরলভাবে বিশ্বাস করা। মহান আল্লাহ বলেছেন তিনি অমুক্ষাপেক্ষী ও অতুলনীয় এবং তিনিই বলেছেন তিনি আরশের ঊর্ধ্বে অধিষ্ঠান করেছেন। এ থেকে আমরা বুঝি যে, কোনোরূপ মুখাপেক্ষিতা বা প্রয়োজন ছাড়াই আল্লাহ তা করেছেন এবং তাঁর এ বিশেষণ কোনোভাবেই কোনো সৃষ্টির সাথে তুলনীয় নয়। তবে কেন করেছেন, কিভাবে করেছেন বা এর স্বরূপ কী তা তিনি আমাদের বলেন নি। এগুলি নিয়ে প্রশ্ন করা বা উত্তরের সন্ধান করা দীনের মধ্যে নব-উদ্ভাবন বা বিদআত। কারণ সাহাবীগণ কখনো এরূপ প্রশ্ন বা উত্তর সন্ধান করেন নি। ইমাম আবূ হানীফা উল্লেখ করেছেন যে, মানবীয় সহজাত প্রকৃতিই মহান আল্লাহর ঊর্ধ্বত্ব প্রমাণ করে। মানুষ প্রকৃতিগতভাবে আল্লাহকে ডাকতে ঊর্ধ্বমুখি হয়। এছাড়া হাদীসে এ ঊর্ধ্বত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি বলেন:
مَنْ قَالَ لاَ أَعْرِفُ رَبِّيْ فِيْ السَّمَاءِ أَوْ فِيْ الأَرْضِ فَقَدْ كَفَرَ وَكَذَا مَنْ قَالَ إَنَّهُ عَلَى الْعَرْشِ وَلاَ أَدْرِيْ الْعَرْشَ أَفِيْ السَّمَاءِ أَوْ فِيْ الأَرْضِ لأَنَّ اللهَ يَقُوْلُ: الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى وَاللهُ تَعَالَى يُدْعَى مِنْ أَعْلَى لاَ مِنْ أَسْفَلَ لَيْسَ مِنْ وَصْفِ الرُّبُوْبِيَّةِ وَالأُلُوْهِيَّةِ فِيْ شَيْءٍ وَعَلَيْهِ مَا رُوِىَ فِيْ الْحَدِيْثِ أَنَّ رَجُلاً أَتَى إِلَى النَّبِيِّ r بِأَمَةٍ سَوْدَاءَ فَقَالَ: وَجَبَ عَلَيَّ عِتْقُ رَقَبَةٍ، أَفَتُجْزِئُ هَذِهِ؟ فَقَالَ لَهَا النَّبِيُّ r: أَمُؤْمِنَةٌ أَنْتِ؟ فَقَالَتْ: نَعَمْ. فَقَالَ: أَيْنَ اللهُ فَأَشَارَتْ إِلَى السَّمَاءِ. فَقَالَ: اعْتِقْهَا فَإِنَّهَا مُؤْمِنَةٌ.
যদি কেউ বলে যে, আমার রব্ব আকাশে না পৃথিবীতে তা আমি জানি না তবে সে কাফির হয়ে যাবে। যদি কেউ বলে যে, তিনি আরশের উপরে, কিন্তু আরশ কোথায়- আসমানে না যমিনে- তা আমি জানি না তবে সেও অনুরূপ। কারণ আল্লাহ বলেছেন: দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমাসীন। মহান আল্লাহকে ডাকতে হয় ঊর্ধে, নিম্নে নয়। নিম্নে থাকা রুবূবিয়্যাত বা উলূহিয়্যাতের কোনো বিশেষত্ব নয়। আর এ অর্থেই হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা.-এর নিকট একটি কাফ্রী দাসীকে নিয়ে আগমন করে বলে যে, তাকে একটি দাস মুক্ত করতে হবে। এ দাসীকে মুক্ত করলে কি তার দায়িত্ব পালন হবে? তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) উক্ত দাসীকে বলেন, তুমি কি ঈমানদার? সে বলে: হ্যাঁ। তিনি বলেন: আল্লাহ কোথায়? সে আসমানের দিকে ইশারা করে। তখন তিনি বলেন: একে মুক্ত করে দাও, এ নারী ঈমানদার। আকীদা তাহাবিয়ার ব্যাখ্যায় ইবন আবীল ইজ্জ হানাফী বলেন: শাইখুল ইসলাম আবূ ইসমাঈল আনসারী (৪৮১ হি) তাঁর আল-ফারূক গ্রন্থে আবূ মুতী বালখী পর্যন্ত সনদে উদ্ধৃত করেছেন, আবূ মুতী বলেন, আবূ হানীফাকে (রাহ) প্রশ্ন করলাম: যে ব্যক্তি বলে, আমার রব্ব আসমানে না যমীনে তা আমি জানি না, তার বিষয়ে আপনার মত কি? তিনি বলেন: এ ব্যক্তি কাফির। কারণ আল্লাহ বলেছেন: দয়াময় আল্লাহ আরশের উপরে সমাসীন, আর তাঁর আরশ সপ্ত আসমানের উপরে। আমি (আবু মুতী) বললাম: যদি সে বলে, তিনি আরশের উপরে, কিন্তু সে বলে: আরশ কি আসমানে না যমীনে তা আমি জানি না, তাহলে কি হবে? তিনি (আবূ হানীফা) বলেন: তাহলেও সে কাফির। কারণ সে তাঁর আসমানে বা ঊর্ধে হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে, আর যে ব্যক্তি তাঁর ঊর্ধ্বত্ব অস্বীকার করবে সে কাফির। ... ইসতিওয়া ও অন্যান্য বিশেষণ বিষয়ে ইমাম আহমদ ইবন হাম্বালের মূলনীতি ও আকীদা ব্যাখ্যা করে আবূ বাকর খাল্লাল আহমদ ইবন মুহাম্মাদ (৩১১ হি) বলেন:
وكان يقول إن الله عز وجل مستو على العرش المجيد ... وكان يقول في معنى الاستواء هو العلو والارتفاع ولم يزل الله تعالى عاليا رفيعا قبل أن يخلق عرشه فهو فوق كل شيء والعالي على كل شيء وإنما خص الله العرش لمعنى فيه مخالف لسائر الأشياء والعرش أفضل الأشياء وأرفعها فامتدح الله نفسه بأنه على العرش أستوى أي عليه علا ولا يجوز أن يقال أستوى بمماسة ولا بملاقاة تعالى الله عن ذلك علوا كبيرا والله تعالى لم يلحقه تغير ولا تبدل ولا تلحقه الحدود قبل خلق العرش ولا بعد خلق العرش. وكان ينكر على من يقول إن الله في كل مكان بذاته لأن الأمكنة كلها محدودة وحكي عن عبد الرحمن بن مهدي عن مالك أن الله تعالى مستو على عرشه المجيد كما أخبر وأن علمه في كل مكان ولا يخلوا شيء من علمه وعظم عليه الكلام في هذا واستبشعه
ইমাম আহমদ বলতেন, মহান আল্লাহ আরশের উপর অধিষ্ঠিত। ... অধিষ্ঠিত হওয়ার অর্থ তিনি এর ঊর্ধ্বে। মহান আল্লাহ আরশ সৃষ্টির পূর্ব থেকেই সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি সকল কিছুর ঊর্ধ্বে এবং সকল কিছুর উপরে। এখানে আরশকে উল্লেখ করার কারণ আরশের মধ্যে এমন বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য কোনো কিছুর মধ্যে নেই। তা হলো আরশ সবচেয়ে মর্যাদাময় সৃষ্টি এবং সব কিছুর ঊর্ধ্বে। মহান আল্লাহ নিজের প্রশংসা করে বলেছেন যে, তিনি আরশের উপর অধিষ্ঠিত, অর্থাৎ তিনি আরশের ঊর্ধ্বে। আরশের উপরে অধিষ্ঠানের অর্থ আরশ স্পর্শ করে অবস্থান করা নয়। মহান আল্লাহ এরূপ ধারণার অনেক ঊর্ধ্বে। আরশ সৃষ্টির পূর্বে এবং আরশ সৃষ্টির পরে মহান আল্লাহ একই অবস্থায় রয়েছেন; কোনোরূপ পরিবর্তন তাঁকে স্পর্শ করে নি, কোনো গণ্ডি বা সীমা তাঁকে সীমায়িত করতে পারে না। যারা বলেন যে, মহান আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান তাদের কথা তিনি অস্বীকার ও প্রতিবাদ করতেন। কারণ সকল স্থানই গণ্ডি বা সীমায় আবদ্ধ। তিনি আব্দুর রাহমান ইবন মাহদী থেকে, তিনি ইমাম মালিক থেকে উদ্ধৃত করতেন: মহান আল্লাহ মহা-পবিত্র আরশের ঊর্ধ্বে সমাসীন এবং তাঁর জ্ঞান-ইলম সর্বত্র বিদ্যমান। কোনো স্থানই তাঁর জ্ঞানের আওতার বাইরে নয়। আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমান কথাটি ইমাম আহমদ ঘৃণ্য বলে গণ্য করতেন। ইমাম তাহাবী (রাহ) বলেন:
وَتَعَالَى عَنِ الْحُدُودِ وَالْغَايَاتِ، وَالأَرْكَانِ وَالأَعْضَاءِ وَالأَدَوَاتِ، لا تَحْوِيهِ الْجِهَاتُ السِّتُّ كَسَائِرِ الْمُبْتَدَعَاتِ. .... وَالْعَرْشُ وَالْكُرْسِيُّ حَقٌّ، وَهُوَ مُسْتَغْنٍ عَنِ الْعَرْشِ وَمَا دُونَهُ، مُحِيطٌ بِكُلِّ شَيْءٍ وَفَوْقَهُ
আল্লাহ্ তাআলা সীমা-পরিধি, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও উপাদান-উপকরণের বহু ঊর্ধ্বে। যাবতীয় উদ্ভাবিত সৃষ্ট বস্তুর ন্যায় তাঁকে ষষ্ঠ দিক পরিবেষ্টন করতে পারে না। আল্লাহর আরশ ও কুরসী (আসন) সত্য। আরশ ও তার নীচে যা কিছু বিদ্যমান সব কিছু থেকে তিনি অমুখাপেক্ষী। তিনি সকল কিছুকে পরিবেষ্টনকারী এবং সকল কিছুর ঊর্ধ্বে। অর্থাৎ তিনি তাঁর সৃষ্ট দিক, স্থান ও সীমার ঊর্ধ্বে। তবে সৃষ্টির সীমা যেখানে শেষ তার ঊর্ধ্বে তাঁর মহান আরশ। আরশ সকল সৃষ্টিকে পরিবেষ্টন করে বিদ্যমান। তিনি তারও ঊর্ধ্বে। কাজেই তিনি সকল কিছুর ঊর্ধ্বে এবং সকল কিছুকে পরিবেষ্টনকারী। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী বলেন:
وهو فوق العرش كما وصف نفسه، لكن لا بمعنى التحيز ولا الجهة، بل لا يعلم كنه هذا التفوق والاستواء إلا هو...
তিনি আরশের ঊর্ধ্বে, যেভাবে তিনি নিজের বিষয়ে বলেছেন। এর অর্থ কোনো দিক বা স্থানে সীমাবদ্ধ হওয়া নয়। বরং এ ঊর্ধ্বত্বের এবং অধিষ্ঠানের প্রকৃতি তিনি ছাড়া কেউ জানে না...। বস্তুত চার ইমামসহ সালাফ সালিহীন বা ইসলামের প্রথম চার প্রজন্মের সকল বুজুর্গ একই আকীদা অনুসরণ করতেন। তাঁরা সকলেই কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত বিশেষণগুলোকে সরল অর্থে বিশ্বাস করতে এবং ব্যাখ্যা ও তুলনা বর্জন করতে নির্দেশ দিতেন। এ প্রসঙ্গে ইমাম বুখারী প্রথম হিজরী শতকের দুজন প্রসিদ্ধ তাবিয়ীর মত উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন:
قال أبو العالية (استوى إلى السماء) ارتفع.. وقال مجاهد (استوى) علا (على العرش)
(প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুহাদ্দিস ও ফকীহ রুফাই ইবন মিহরান) আবুল আলিয়া (৯০ হি) বলেন: আসমানের প্রতি ইসতিওয়া করেছেন অর্থ: আসমানের উপরে থেকেছেন। (অন্য প্রসিদ্ধ তাবিয়ী মুফাস্সির ও ফকীহ ইমাম) মুজাহিদ (১০৪ হি) বলেন: আরশের উপর ইসতিওয়া করেছেন অর্থ আরশের ঊর্ধ্বে থেকেছেন। ইমাম আবূ হানীফার সমসাময়িক প্রসিদ্ধ তাবি-তাবিয়ী মুহাদ্দিস ও মুজতাহিদ ফকীহ ইমাম আওযায়ী আব্দুর রাহমান ইবন আমর (১৫৭ হি) বলেন:
كنا والتابعون متوافرون نقول إن الله على عرشه ونؤمن بما وردت به السنة من صفاته
যে সময়ে তাবিয়ীগণ বহু সংখ্যায় বিদ্যমান ছিলেন সে সময়ে আমরা বলতাম: মহান আল্লাহ তাঁর আরশের উপরে এবং সুন্নাতে (হাদীসে) মহান আল্লাহর যা কিছু বিশেষণ বর্ণিত হয়েছে তা আমার বিশ্বাস করি। মহান আল্লাহর বিশেষণ ব্যাখ্যায় কিছু বলার অর্থ মহান আল্লাহ সম্পর্কে মানবীয় যুক্তি, বুদ্ধি বা ইজতিহাদ দিয়ে কিছু বলা। আর মহান আল্লাহর বিষয়ে ইজতিহাদ করে কিছু বলা যাবে না। এজন্য ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) বলেন:
لا ينبغي لأحد أن ينطق في الله تعالى بشئ من ذاته، ولكن يصفه بما وصف سبحانه به نفسه، ولا يقول فيه برأيه شيئاً تبارك الله تعالى رب العالمين
মহান আল্লাহর বিষয়ে নিজের পক্ষ থেকে কিছু বলা কারো জন্য বৈধ নয়; বরং তিনি নিজের জন্য যে বিশেষণ ব্যবহার করেছেন তাঁর বিষয়ে শুধু সে বিশেষণই ব্যবহার করতে হবে। এ বিষয়ে নিজের মত, যুক্তি বা ইজতিহাদ দিয়ে কিছুই বলা যাবে না। মহাপবিত্র, মহাসম্মানিত-মহাকল্যাণময় আল্লাহ বিশ্বজগতের প্রতিপালক। ইমাম শাফিয়ীর ছাত্র আবূ সাওর বলেন, ইমাম শাফিয়ী বলেন:
القول في السُّنّة التي وردت وأنا عليها، ورأيتُ أصحابنا عليها أهل الحديث الذين رأيتُهم وأخذتُ عنهم ـ مثل: سفيان الثّوريّ ومالك وغيرهما ـ : الإقرار بشهادة أن لا إله إلا الله وأنّ محمّدًا رسول الله، وأنّ الله ـ تعالى ـ على عرشه في سمائه، يقرب من خلقه كيف شاء، وأنّ الله تعالى ينزل إلى السّماء الدُّنيا كيف شاء
সুফিয়ান সাওরী, মালিক ও অন্যান্য যে সকল মুহাদ্দিসকে আমরা দেখেছি এবং তাঁদের থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছি, আমাদের সে সব সাথী এবং আমি যে সুন্নাত আকীদার উপর রয়েছি তা হলো এরূপ সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবূদ নেই, এবং মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহর রাসূল, এবং মহান আল্লাহ তাঁর আরশের উপরে তাঁর আসমানের ঊর্ধ্বে, তিনি যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে বান্দার নিকটবর্তী হন এবং তিনি যেভাবে ইচ্ছা করেন সেভাবে প্রথম আসমানে অবতরণ করেন। মহান আল্লাহ সর্বত্র বিরাজমান এরূপ বিশ্বাসকে ইমামগণ অত্যন্ত ঘৃণা করতেন। এ মতকে তারা সর্বেশ্বরবাদ বা সর্বজীবে ঈশ্বর মতবাদ বলে গণ্য করতেন। বাশ্শার ইবন মূসা খাফ্ফাফ বলেন:
جاء بشر بن الوليد الكندي إلى القاضي أبي يوسف فقال له تنهاني عن الكلام وبشر المريسي وعلي الأحول وفلان يتكلمون قال وما يقولون قال يقولون الله في كل مكان فقال أبو يوسف علي بهم فانتهوا إليهم وقد قام بشر فجيء بعلي الأحول وبالآخر شيخ فقال أبو يوسف ونظر إلى الشيخ لو أن فيك موضع أدب لأوجعتك فأمر به إلى الحبس وضرب الأحول وطوف به
বিশর ইবন ওলীদ কিন্দী কাযী আবূ ইউসুফের নিকট আগমন করে বলেন: আপনি তো আমাকে ইলমুল কালাম থেকে নিষেধ করেন, কিন্তু বিশর আল-মারীসী, আলী আল-আহওয়াল এবং অমুক ব্যক্তি কালাম নিয়ে আলোচনা করছে। আবূ ইউসুফ বলেন: তারা কী বলছে? তিনি বলেন: তারা বলছে যে, আল্লাহ সকল স্থানে বিরাজমান। তখন আবূ ইউসুফ বলেন: তাদেরকে ধরে আমার কাছে নিয়ে এস। তখন তারা তাদের নিকট গমন করে। ইত্যবসরে বিশর আল-মারীসী উক্ত স্থান পরিত্যাগ করেছিলেন। এজন্য আলী আহওয়াল এবং অন্য একজন বৃদ্ধ ব্যক্তিকে ধরে আনা হয়। আবূ ইউসুফ বৃদ্ধ ব্যক্তিটির দিকে দৃষ্টিপাত করে বলেন: আপনার দেহে শাস্তি দেওয়ার মত স্থান থাকলে আমি আপনাকে বেত্রাঘাতের নির্দেশ দিতাম। তিনি উক্ত বৃদ্ধকে কারারুদ্ধ করার নির্দেশ দেন এবং আলী আহওয়ালকে বেত্রাঘাত করা হয় এবং রাস্তায় ঘুরানো হয়। এ বিষয়ে উদ্ধৃতিগুলোর তথ্যসূত্র জানতে ও বিস্তারিত আলোচনা পড়তে আবারো আপপনকে ইমাম আবূ হানীফা (রাহ) রচিত আলি-ফিকহুল আকবার: বঙ্গানুবাদ ও ব্যাখ্যা বইটি পড়তে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নটি করার জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। নিচে এবিষয়ে সামান্য আলোচনা করা হল, আশা করি আপনি তাতে আপনার উত্তর খুঁজে পাবেন ইনশাল্লাহ। রাসূল সাঃ সৃষ্টিগতভাবে আমাদের মতই মানুষ ছিলেন নূরের তৈরি ছিলেন না। কুরআন-হাদীসে বারংবার উল্লেখ করা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সা. অন্যদের মতই মানুষ। এমনকি যুগে যুগে নবী-রাসূলদের দাওআত অস্বীকার করার ক্ষেত্রে অবিশ্বাসীদের প্রধান দাবি ছিল যে নবীগণ তো মানুষ মাত্র এরা আল্লাহর নবী হতে পারেন না। আল্লাহ যদি কাউকে পাঠাতেই চাইতেন তবে ফিরিশতা পাঠিয়ে দিতেন। যেহেতু এরা মানুষ সেহেতু এদের নুবুওয়াতের দাবি মিথ্যা। এদের কথার প্রতিবাদে নবীগণ তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে আমরা তোমাদের মত মানুষ এ কথা ঠিক তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষ হলে আল্লাহর ওহী ও নুবুওয়াতের মর্যাদা লাভ করা যায় না। বরং আল্লাহ মানুষদের মধ্য থেকেই যাকে ইচ্ছা নবী বা রাসূল হিসেবে বেছে নেন এ বিষয়ে এখানে কয়েকটি আয়াত এবং হাদীস উল্লেখ করা হল। বাশার بَشَرٌ অর্থ মানুষ মানুষগণ বা মানুষজাতি (man, human being, men, mankind( কুরআন কারীমে প্রায় ৪০ স্থানে বাশারশব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে এই একই অর্থে। একবচন ও বহুবচন উভয় অর্থেই শব্দটি ব্যবহৃত হয়। কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে রাসূলুল্লাহ সা. বাশার বা মানুষ। এছাড়া উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি অন্যদের মত মানুষ। এ বিষয়ে মহান আল্লাহ বলেন:
وَقَالُوا لَنْ نُؤْمِنَ لَكَ حَتَّى تَفْجُرَ لَنَا مِنَ الأَرْضِ يَنْبُوعًا أَوْ تَكُونَ لَكَ جَنَّةٌ مِنْ نَخِيلٍ وَعِنَبٍ فَتُفَجِّرَ الأَنْهَارَ خِلالَهَا تَفْجِيرًا أَوْ تُسْقِطَ السَّمَاءَ كَمَا زَعَمْتَ عَلَيْنَا كِسَفًا أَوْ تَأْتِيَ بِاللَّهِ وَالْمَلائِكَةِ قَبِيلا أَوْ يَكُونَ لَكَ بَيْتٌ مِنْ زُخْرُفٍ أَوْ تَرْقَى فِي السَّمَاءِ وَلَنْ نُؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتَّى تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَقْرَؤُهُ قُلْ سُبْحَانَ رَبِّي هَلْ كُنْتُ إِلا بَشَرًا رَسُولا وَمَا مَنَعَ النَّاسَ أَنْ يُؤْمِنُوا إِذْ جَاءَهُمُ الْهُدَى إِلا أَنْ قَالُوا أَبَعَثَ اللَّهُ بَشَرًا رَسُولا
এবং তারা বলে কখনই আমরা আপনার প্রতি ঈমান আনব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের জন্য ভূমি হতে একটি ঝর্ণাধারা উৎসারিত করবেন। অথবা আপনার একটি খেজুরের ও আঙ্গুরের বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে আপনি নদী-নালা প্রবাহিত করে দেবেন। অথবা আপনি যেমন বলে থাকেন তদনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলবেন অথবা আল্লাহ ও ফিরিশতাগণকে আমাদের সামনে এনে উপস্থিত করবেন। অথবা আপনার একটি অলংকৃত স্বর্ণ নির্মিত গৃহ হবে। অথবা আপনি আকাশে আরোহণ করবেন তবে আমরা আপনার আকাশ আরোহণে কখনো বিশ্বাস করব না যতক্ষণ না আপনি আমাদের (আসমান থেকে) একটি কিতাব অবতীর্ণ করবেন যা আমরা পাঠ করব। বল পবিত্র আমার প্রতিপালক (সুবহানাল্লাহ!)! আমি তো কেবলমাত্র একজন মানুষ একজন রাসূল। আর মানুষের কাছে যখন হেদায়েতের বানী আসে তখন তো তারা শুধু একথা বলে ঈমান আনয়ন করা থেকে বিরত থাকে যে আল্লাহ কি একজন মানুষকে রাসূল করে পাঠিয়েছেন সূরা-আল ইসরা আয়াত ৯০-৯৪। অর্থাৎ কাফিরদের দাবি যে, আল্লাহর রাসূল হওয়ার অর্থ আল্লাহর ক্ষমতার কিছু অংশ লাভ করা। পক্ষান্তরে মহান আল্লাহ জানালেন যে, রাসূল হওয়ার অর্থ আল্লাহর নিদের্শ অনুসারে প্রচারের দায়িত্ব লাভ, ক্ষমতা লাভ নয়; ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর। অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন:
قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ يُوحَى إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَمَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلا صَالِحًا وَلا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا
বল: আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ মাত্র আমার প্রতি ওহী পাঠানো হয়েছে যে, তোমাদের মা বুদ (উপাস্য) একমাত্র একই মা বুদ। অতএব যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার প্রতিপালকের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে। সূরা-আল কাহাফ, আয়াত, ১১০। রাসূলুল্লাহ সা. বারবার তাঁর উম্মতকে বিষয়টি শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি একদিকে যেমন আল্লাহ তাঁকে যে মর্যাদা দান করেছেন তা তাঁর উম্মতরক জানিয়েছেন, ঠিক তেমনিভাবে বারবার তাঁর উম্মতকে শিখিয়েছেন যে, তিনি একজন মানুষ। এক হাদীসে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সা. সালাতের মধ্যে ভুল করেন। সালামের পরে সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করেন, হে আল্লাহর রাসূল, সালাতের কি কোনো নতুন বিধান নাযিল হয়েছে? তিনি বলেন: তোমরা এ প্রশ্ন করছ কেন? তারা বলেন: আপনি এমন এমন করেছেন। তখন তিনি সালাত পূর্ণ করেন এবং বলেন:
إِنَّهُ لَوْ حَدَثَ فِي الصَّلاةِ شَيْءٌ لَنَبَّأْتُكُمْ بِهِ وَلَكِنْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي
সালাতের নিয়ম পরিবর্তন করা হলে আমি অবশ্যই তোমাদেরকে জানাতাম। কিন্তু আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ মাত্র। তোমরা যেমন ভুল কর আমিও তেমনি ভুল করি। যদি আমি কখনো ভুল করি তবে তোমরা আমাকে মনে করিয়ে দেবে। বুখারী, আস সাহীহ,কিতাব, বাদউল ওহী, বাব,আত তাওয়াজ্জুহু নাহওয়াল কিবলাতি, হাদীস নং ৪০১। উপরের অর্থে আবূ হুরাইরা, জাবির ইবনু আব্দুল্লাহ, আনাস ইবনু মালিক, ও অন্যান্য সাহাবী (রাদিয়াল্লাহুম) থেকে অনেক হাদীস সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম ও সিহাহ সিত্তার অন্যান্য গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। উপরের আয়াত ও হাদীসসমূহে আমরা দেখতে পেলাম যে, আল্লাহ রাসূল সা. কে বিভিন্ন আয়াতে মানুষ বলেছেন এবং রাসূল সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিভিন্ন হাদীসে নিজেকে মানুষ বলেছেন। রাসূল সা. কে মানুষ বলার পাশাপাশি অনেক আয়াতে মহান মর্যাদার দিক লক্ষ্য করে নূর, বা আল্লাহর নূর,বলা হয়েছে এবং মুফাস্সিরগণ সেখানে নূর অর্থ কুরআন, ইসলাম,মুহাম্মাদ (সা.),ইত্যাদি অর্থ গ্রহণ করেছেন । তবে সেসমস্ত স্থানে রাসূল সা. কে হেদায়াতের আলো ও সঠিক পথের নির্দেশক হিসেবে,নূরবলা হয়েছে, সৃষ্টিগতভাবে নয়। মহান আল্লাহ বলেন:
يَاأَيُّهَا النَّبِيُّ إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا وَدَاعِيًا إِلَى اللَّهِ بِإِذْنِهِ وَسِرَاجًا مُـنِيرًا
হে নবী, আমি আপনাকে পাঠিয়েছি সাক্ষীরূপে এবং সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে, আল্লাহর অনুমতিক্রমে তাঁর দিকে আহবানকারীরূপে এবং আলোকোজ্জ্বল (নূর-প্রদানকারী) প্রদীপরূপে। সূরা- আল আহযাব, আয়াত, ৪৫-৪৬। অপর এক আয়াতে আল্লাহ বলেন:
يَاأَهْلَ الْكِـتَابِ قَدْ جَاءَكُمْ رَسُولُنَا يُـبَيِّنُ لَكُمْ كَثِيرًا مِمَّا كُنْتُمْ تُخْفُونَ مِنْ الْكِتَابِ وَيَعْفُو عَنْ كَثـِيـرٍ قَدْ جَاءَكُمْ مِنْ اللَّهِ نُورٌ وَكِتَابٌ مُبِيـنٌ
হে কিতাবীগণ, আমার রাসূল তোমাদের নিকট এসেছেন, তোমরা কিতাবের যা গোপন করতে তিনি তার অনেক তোমাদের নিকট প্রকাশ করেন এবং অনেক উপেক্ষা করে থাকেন। আল্লাহর নিকট হতে এক নূর ও স্পষ্ট কিতাব তোমাদের নিকট এসেছে। সূরা-আল মায়েদা, আয়াত ১৫। এই আয়াতে নূর বা জ্যোতি বলতে কি বুঝানো হয়েছে সে বিষয়ে মুফাস্সিরগণ মতভেদ করেছেন। কেউ বলেছেন,এখানে নূর অর্থ কুরআন, কেউ বলেছেন, ইসলাম, কেউ বলেছেন, মুহাম্মাদ (সা.)। যারা এখানে নূরঅর্থ মুহাম্মাদ (সা.) বুঝিয়েছেন, তাঁরা দেখেছেন যে, স্পষ্ট কিতাববলতে কুরআনকে বুঝানো হয়েছে। কাজেই নূরবলতে মুহাম্মাদ (সা.)- কে বুঝানোই স্বাভাবিক। এ বিষয়ে ইমাম তাবারী বলেন,
يَعْنِي بِالنُّورِ مُحَمَّدًا صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ, الَّذِي أَنَارَ اللَّهُ بِهِ الْحَقَّ, وَأَظْهَرَ بِهِ الإِسْلاَمَ, وَمَحَقَ بِهِ الشِّرْكَ فَهُوَ نُورٌ لِمَنِ اسْتَنَارَ بِهِ يُبَيِّنُ الْحَقَّ, وَمِنْ إِنَارَتِهِ الْحَقَّ تَبْيِينُهُ لِلْيَهُودِ كَثِيرًا مِمَّا كَانُوا يُخْفُونَ مِنَ الْكِتَابِ
নূর (আলো) বলতে এখানে মুহাম্মাদ (সা.)-কে বুঝানো হয়েছে, যাঁর দ্বারা আল্লাহ হক্ক বা সত্যকে আলোকিত করেছেন,ইসলামকে বিজয়ী করেছেন এবং র্শিককে মিটিয়ে দিয়েছেন। কাজেই যে ব্যক্তি তাঁর দ্বারা আলোকিত হতে চায় তার জন্য তিনি আলো। তিনি হক্ক বা সত্য প্রকাশ করেন।তাঁর হক্ককে আলোকিত করার একটি দিক হলো যে, ইহূদীরা আল্লাহর কিতাবের যে সকল বিষয় গোপন করত তার অনেক কিছু তিনি প্রকাশ করেছেন। তাফসীর, তাবারী,৬/১৬১। উপরের আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পেলাম যে, কুরআন কারীমে সত্যের দিশারী, হেদায়াতের আলো ও সঠিক পথের নির্দেশক হিসেবে কুরআন কারীমকে নূরবলা হয়েছে। অনুরূপভাবে কোনো কোনো আয়াতে নূর শব্দের ব্যাখ্যায় কোনো কোনো মুফাস্সির রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বা ইসলামকে বুঝানো হয়েছে বলে মত প্রকাশ করেছেন। কুরআন কারীমের এ সকল বর্ণনা থেকে বুঝা যায় না যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা.), কুরআন বা ইসলাম নূরের তৈরী বা নূর থেকে সৃষ্ট। আমরা বুঝতে পারি যে, এখানে কোনো সৃষ্ট, জড় বা মূর্ত নূর বা আলো বুঝানো হয় নি। রাসূলুল্লাহ সা., ইসলাম ও কুরআন কোনো জাগতিক, জড়, ইন্দ্রিয়গাহ্য বা মূর্ত আলো নয়। এ হলো বিমূর্ত, আত্মিক, আদর্শিক ও সত্যের আলোকবর্তিকা, যা মানুষের হৃদয়কে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাসের অন্ধকার থেকে বিশ্বাস, সত্য ও সুপথের আলোয় জ্যোতির্ময় করে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এব্যাপারে সঠিক আকীদা পোষণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন। এব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য পাঠককে ইসলামী আকীদা ও হাদীসের নামে জালিয়াতি বইটি পড়তে অনুরোধ করছি।
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রশ্নটি করার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। নিম্নে উক্ত বিষয়ে আলোচনা করা হল। আশা করি আপনি তাতে আপনার প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবেন ইনশাল্লাহ। আত্যহত্যা করার হুকুমঃ আত্যহত্যা নিঃসন্দেহে কবীরা গুনাহ এবং মূলত এটি একটি কুফরী গোনাহ যার শাস্তি অনন্তকাল জাহান্নাম। একজন মানুষ আত্যহত্যা করার কারণ কয়েকটি হতে পারে। প্রথমতঃব্যক্তি যখন আত্যহত্যা করে তখন সে সাধারনত আলাহর রহমত হতে নিরাশ হয়েই এই জঘন্য পাপকাজে লিপ্ত হয়। কারণ কোনোরূপ আশা থাকলে কেউ আত্মহত্যা করেন না। যখন কেউ চিন্তা করে যে, আমার জীবনের উন্নতির, কল্যাণের বা ভালর কোনো আশা আর নেই তখনই সে আত্মহত্যা করে। আর এ হলো মহান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া। আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া কুফুরী। কোরআনে আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হতে বারবার নিষেধ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন:
وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ
অর্থঃ তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না । কেবল মাত্র কাফের সম্প্রদায়ই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়। সূরা ইউসুফ,আয়াত-৮৭। দ্বিতীয়তঃ সে বৈধ মনে করে আত্যহত্যা করবে। এক্ষেত্রেও তার এ কাজ কোরআন হাদীসের দৃষ্টিতে কুফুরী হিসাবে বিবেচিত হবে। কোরআন ও হাদীসে হালালকে হারাম মনে করা এবং হারামকে হালাল বা বৈধ মনে করাকে কঠিনভাবে নিষেধ করা হয়েছে এবং এটাকে কুফুরী হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। তৃতীয়তঃ উক্তব্যক্তি নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে এই ভয়াবহ অন্যায় কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। উপরের দুটি অবস্থায় আত্মহত্যাকারীর ক্ষমার কোনোই আশা থাকে না। তৃতীয় পর্যায়ের লোকটির ক্ষমার সামান্য একটু সম্ভাবনা থাকে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আত্মহত্যাকারী ব্যক্তির বিষয়ে আমরা জানিনা যে, সে কোন অবস্থাতে আত্যহত্যার পথ বেছে নিল। সে যে অবস্থাতে বা যে কারনেই আত্যহত্যা করুক নিঃসন্দেহে এটা অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং কবীরাহ গুনাহ। রাসূল সা. আত্যহত্যাকারীর ব্যাপারে চিরদিন জাহান্নামে থাকার মত ভয়াবহ শাস্তির কথাও হাদীস শরীফে একাধিকবার উল্লেখ করেছেন। হযরত আবু হুরাইরা রাঃ থেকে বর্ণীত এক হাদীসে রাসূল সা. বলেন:
مَن تردى من جبل فقتل نفسه فهو في نار جهنم يتردى فيه خالداً مخلداً فيها أبداً ، ومَن تحسَّى سمّاً فقتل نفسه فسمُّه في يده يتحساه في نار جهنم خالداً مخلداً فيها أبداً ، ومَن قتل نفسه بحديدة فحديدته في يده يجأ بها في بطنه في نار جهنم خالداً مخلداً فيها أبداً
অর্থঃ যে ব্যক্তি আত্যহত্যার উদ্দেশ্যে পাহাঢ় থেকে পড়ে মৃত্যুবরণ করবে সে জাহান্নামের আগুনে চিরোদিন পড়তে থাকবে। আর যে বিষ পান করে আত্যহত্যা করবে বিষ তার হাতে থাকবে এবং জাহান্নামের আগুনে চিরদিন সে তা পান করতে থাকবে। আর যে লোহার টুকরা দিয়ে আত্যহত্যা করবে উক্ত লোহার টুকরা তার হাতে থাকবে এবং জাহান্নামের আগুনে সে চিরদিন তা পেটের ভিতর ঢুকাতে থাকবে। বুখারী,আস সহীহ, বাব, শুরবিস সাম্মি, হাদীস নং ৫৭৭৮। সাবেত ইবনে দহহাক রাঃ থেকে বর্ণীত একটি হাদীসে তিনি বলেন:
مَن قتل نفسه بشيء في الدنيا عذب به يوم القيامة
অর্থঃ যে ব্যক্তি দুনিয়ার কোন জিনিস দ্বারা আত্যহত্যা করল কিয়ামতের দিন তাকে তা দ্বারা শাস্তি দেয়া হবে। বুখারী, আস সাহীহ, হাদীস নং ৬৬৪৭। মুসলিম, আস সহীহ, হাদীস নং ৩১৬। জুনদুব ইবনে আব্দুল্লাহ রাঃ এর সূত্রে বর্ণীত একটি হাদীসে আছে:
قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : كان فيمن كان قبلكم رجل به جرح فجزع فأخذ سكيناً فحز بها يده فما رقأ الدم حتى مات . قال الله تعالى : بادرني عبدي بنفسه حرمت عليه الجنة
অর্থঃ তোমাদের পূর্বে একব্যক্তির শরীরে যখম ছিলো সে ধৈর্যহারা হয়ে পড়ল একটি ছুরি দ্বারা নিজের হাত কেটে ফেলল এবং রক্ত বন্ধ হলনা। অবশেষে লোকটি মারা গেল। আল্লাহ তায়ালা বললেন: আমার বান্দা তাড়াহুড়া করেছে তার জন্য জান্নাত হারাম। বুখারী, আস সহীহ, হাদীস নং ৩৪৬৩। এ সকল হাদীস প্রমাণ করে যে, আত্মহত্যাকারীর জন্য মুক্তির আশা নেই। সে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে। রাসূল সা. আত্যহত্যা কারীর জানাযার নামাজে শরীক হতে অস্বীকার করেন। জাবের ইবনে সামুরা রাঃ থেকে বর্ণীত তিনি বলেন:
أُتي النبي صلى الله عليه وسلم برجل قتل نفسه بمَشاقص فلم يصل عليه
অর্থঃ তীর দ্বারা আত্যহত্যা করেছে এমন এক ব্যক্তিকে রাসূল সাঃ এর কাছে আনা হল ক্ন্তিু তিনি তার জানাযার নামাজ পড়লেন না। বুখারী আস সহীহ, বাব,তারকুস সালাতি আলা ক্বাতিলি নাফসিহী, হাদীস নং ২৩০৯। তার জানাযার নামাজঃ ইমাম নববী রহঃ বলেন: উপরোক্ত হাদীসের আলোকে উমার ইবনে আব্দুল আজীজ এবং আওজায়ী রহঃ বলেন আত্যহত্যা কারীর জানাজার নামাজ পড়া যাবে না। পক্ষান্তরে হাসান বসরী, ইমাম নাখয়ী, ইমাম মালেক, ইমাম আবু হানীফা এবং ইমাম শাফী রহঃ সহ অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের মতে আত্যহত্যা কারীর জানাযার নামাজ পড়তে হবে। কেননা রাসূল সা. নিজে এমন ব্যক্তির জানাযার নামাজে শরীক না হলেও সাহাবয়ে কেরামকে এব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেছেন এবং সাহাবায়ে কেরাম তার জানাযার নামাজ পড়েছেন। যেমন তিনি ইসলামের শুরুর যুগে কেউ ঋনি হয়ে মারা গেলে (ঋন আদায়ে অবহেলা করার ব্যাপারে সতর্ক করার জন্য) তার জানাযায় শরীক হতেন না এবং সাহাবায়ে কেরামকে তার জানাযায় শরীক হতে আদেশ করতেন। তিনি বলতেন: صَلُّوا عَلَى صَاحِبكُمْ (তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযার নামাজ পড়)। বুখারী, আস-সহীহ, হাদীস নং ২২৮৯। কাজী ইয়াজ বলেন, সকল উলামায়ে কেরামের মত হল, প্রত্যেক মুসলমানের জানাযার নামাজ পড়া হবে। ব্যাক্তি হোক হদের শাস্তি প্রাপ্ত, রজমকৃত, আত্যহত্যাকারী কিংবা অবৈধ সন্তান। (শরহুন নববী আলা মুসলিম, ৩/৪০৫। কিতাব, আলজানাইয, বাব, তারকুস সালাত আলাল কাতিলি নাফসিহি। (শামিলা) এ হিসাবে উলামায়ে কেরামের মতে সুন্নাত হল, আলেম বা শ্রেষ্ঠব্যাক্তিরা আত্যহত্যাকারীর জানাযায শরীক হবেনা বরং সাধারন মানুষদের মাধ্যমে তার জানাযার নামাজ সম্পূর্ণ করা হবে। চিরোদিন জাহান্নামে থাকাঃ উপরের হাদীসগুলোতে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ .... বারবার বলেছেন যে, আত্মহত্যাকারী অনন্তকাল জাহান্নামে থাকবে। এর বিপরীতে মূলত কোনো হাদীস নেই। তবে দু-একটি হাীসের প্রাসঙ্গিক নিরর্শনা ও ইসলামের মূলনীতির আলোকে আলিমগণ বলেছেন যে, যে ব্যক্তি তাওহীদের উপর মৃত্যুবরণ করবে সে চিরদিন জাহান্নামে থাকবে না যদিও সে কবীরা গুনাহে লিপ্ত হয়। উপরে উাল্লেখিত হাদীসগুলোতে আত্যহত্যাকারীর চিরদিন জাহান্নামে থাকার যে কথা এসেছে উলামায়ে কেরাম এ হাদীসের ব্যাক্ষায় বলেন, যে ব্যক্তি বৈধমনে করে আত্যহত্যা করবে সে তা বৈধ মনে করার কারণে কাফের হয়ে যাবে। অথবা যদি কেউ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে আত্মহত্যা করে তবে তাকে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকতে হবে। যদি সে এটাকে বৈধ মনে না করে বা আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এ মহাপাপ করে ফেলে তবে তার মুক্তির আশা করা যায়। আল্লাহর ইচ্ছায় সে একদিন জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে ইনশাল্লাহ। কারন কোরআনে মহান দয়াময় আল্লাহ একমাত্র শিরক ছাড়া অন্য সকল গুনাহ মাফ করে দেয়ার ওয়াদা করেছেন। তিনি বলেন: إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ (অর্থঃ) নিশ্চই আল্লাহ তাঁর সাথে শিরক করার বিষয়কে ক্ষমা করবেন না। আর তিনি অন্যান্য গুনাহের ব্যাপারে যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিবেন। সূরা নিসা-১১৬। আর আত্মহত্যা শিরক বা কুফর পর্ায়ে না গেলে আমার আশা করতে দয়াময় আল্লাহ তাকে একদিন মাফ করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিবেন। তাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াঃ হা তাদের জন্য দোয়া করা যেতে পারে। একটি হাদীসে এসেছে রাসূল সাঃ এমন ব্যাক্তির জন্য দোয়া করেছেন। হযরত তুফাইল ইবরে আমর দাউসি রাঃ থেকে বর্ণীত একটি হাদীসে এসেছে:
فلما هاجر النبي صلى الله عليه وسلم إلى المدينة هاجر إليه الطفيل بن عمرو وهاجر معه رجل من قومه فاجتووا المدينة فمرض فجزع فأخذ مشاقص له فقطع بها براجمه فشخبت يداه حتى مات، فرآه الطفيل بن عمرو في منامه فرآه وهيئته حسنة، ورآه مغطيا يديه! فقال له: ما صنع بك ربك؟ فقال: غفر لي بهجرتي إلى نبيه صلى الله عليه وسلم. فقال: ما لي أراك مغطيا يديك؟ قال: قيل لي: لن نصلح منك ما أفسدت. فقصها الطفيل على رسول الله صلى الله عليه وسلم فقال رسول الله صلى الله عليه وسلم: اللهم وليديه فاغفر...
অর্থঃ যখন নবী সাঃ মদীনায় হিজরত করলেন তুফাইল ইবরে আমর রাঃ রাসূল সাঃ এর কাছে হিজরত করলেন এবং তার গোত্রের একটি লোক তার সাথে হিজরত করল। যখন তারা মদীনায় পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হল তখন সে কয়েকটি তির নিয়ে তা দ্বারা আঙ্গুলের গিরা কেটে ফেলল এবং দুইহাতা দিয়ে বিরামহীনভাবে রক্ত ঝরতে লাগল এবং অবশেষে সে মৃত্যুবরণ করল। হযরত তুফাইল রাঃ স্বপ্নে তাকে ভাল অবস্থায় দেখতে পেলেন। তবে তার দুই হাত ঢাকা ছিলো। তখন তিনি তাকে জিজ্ঞাসা করলেন তোমার প্রতিপালক তোমার সাথে কেমন আচরণ করেছেন। উত্তরে তিনি বললেন রাসূল সাঃ এর কাছে হিজরত করার কারণে আমাকে মাফ করে দেয়া হয়েছে। তখন তুফাইল রাঃ তাকে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল তোমার হাত ঢাকা দেখছি কেন? তিনি বললেন, আমাকে বলা হল, তোমার যে অংশ তুমি নষ্ট করেছে তা আমি ঠিক করে দিবনা। রাসূল সাঃ এর কাছে এঘটনা শোনানের পর রাসূল সাঃ আল্লাহর কাছে তার জন্য ক্ষমা চেয়ে বললেন, হে আল্লাহ তুমি তার দুই হাতকে মাফ করে দাও। মুসলিম, আস সহীহ খন্ড ১,পৃষ্ঠা ৭৬ হাদীস নং ৩২৬। মোটকথা, আত্যহত্যা অত্যন্ত মারত্নক একটি কবীরাহ গুনাহ। এব্যাপারে রাসূল সা. এর পক্ষথেকে চিরদিন জাহান্নামে থাকার মত কঠোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি কাজটি কুফুরী হিসাবে গণ্য হওয়ারও সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। যদি আল্লাহ দয়া করে তাকে অন্য কোন ভাল কাজের বিনিময়ে জাহান্নাম থেকে উদ্ধার করেন তাহলে সেটা ভিন্ন কথা। তবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা একেবারেই কম। কিন্তু কেউ যদি একাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে তাহলে তার জন্য দোয়া করাতে কোন দোষ নেই। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে মাফ করলেও করতে পারেন। আল্লাহ আমাদের সবাইকে উত্তম মৃত্যু দান করুন। আমীন।